আজ || শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২
শিরোনাম :
 


অবশেষে উচ্ছেদ করা হলো গোপালপুরের সেই ৪টি অবৈধ সেচপাম্প

গোপালপুর বার্তা ডেক্স :
অনেক জল ঘোলার পর আদালতের হস্তক্ষেপে অবশেষে গোপালপুর উপজেলা প্রশাসন উচ্ছেদ করলো অবৈধ চারটি ডিজলচালিত সেচপাম্প। এতে সরকারি সেচ নীতিমালা ভঙ্গকারিরা দাপট দেখিয়েও শেষাবধি মুখ লুকাতে বাধ্য হয়।

জানা যায়, গোপালপুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সংরক্ষিত মহিলা সদস্য এবং মহিলালীগ নেত্রী নাসরীন কামাল জোতআতাউল্লাহ গ্রামে টানা ১৩ বছর ধরে বিদ্যুৎ চালিত অগভীর সেচ স্কীম পরিচালনা করছেন। ওই ইউনিয়নে সরকারি দলের কোন্দলের জেরে একটি প্রভাবশালী মহল তাঁর সেচ স্কীমের কমান্ডিং এরিয়ায় জোরপূর্বক ডিজেলচালিত একাধিক সেচ স্কীম চালু করাসহ তাঁকে নানাভাবে নাজেহাল শুরু করে। এমতাবস্থায় নাসরীন কামালের অভিযোগের প্রেক্ষিত ২০২০ সালে উপজেলা প্রশাসন একটি অবৈধ ডিজেল ইঞ্জিন উচ্ছেদ করেন। এর মধ্যে সরকার প্রান্তিক চাষীদের সুলভ সেচ নিশ্চিতকরণে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করেন।

ময়মনসিংহ পবিস-১ এর সার্কুলার থেকে জানা যায়, গত সেচ মৌসুমে টাঙ্গাইলের গোপালপুর, মধুপুর, ধনবাড়ী ও ঘাটাইল উপজেলায় ৯০টি সৌর সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা। এর মধ্যে গোপালপুর উপজেলায় সৌর সেচ প্রকল্প ছিল ১১টি। কিন্তু প্রভাবশালীরা বিরাধীতা করায় প্রকল্পের পুরাটাই মুখ থুবড়ে পড়ে। শুধুমাত্র নাসরীন কামাল উপজেলা সেচ কমিটির লাইসেন্স নিয়ে ১৫ শতক জমি মর্টগেজ এবং ৫০ হাজার টাকা জামানত দিয়ে ময়মনসিংহ পবিস-১ থেকে ৫ লক্ষ টাকা মূল্যের সৌর প্যাকেজ ক্রয় করেন। গত নভেম্বরে বিদ্যুৎ কর্মীরা সৌর বিদ্যুতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে গেলে ওই প্রভাবশালী মহলের লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে বাধা দেয়। ফলে যাবতীয় বিদ্যুৎ সরঞ্জাম মাঠে ফেলে বিদ্যুৎ কর্মীরা চলে যায়।

এরপর ওই প্রভাবশালী মহল নাসরীন কামালের সেচ স্কীমের কমান্ড এরিয়ার ১০০ ফিটের মধ্যে ৪টি ডিজেল চালিত অবৈধ অগভীর নলকূপ স্থাপন করে। ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁর স্কীম বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাজানো মামলা দিয়ে চলে তাঁকে হয়রানি। পরে নাসরীন কামাল প্রতিকার চেয়ে উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. পারভেজ মল্লিকের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। উপজেলা প্রশাসন সেচ কমিটির অন্যতম সদস্য বিএডিসির সেচ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে এ অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেন।

বিএডিসির ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের উপসহকারি প্রকৌশলী সজীব মিয়া সরজমিন তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে জানান, নাসরীন কামালের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বৈধ সেচ স্কীমের কমান্ড এরিয়ার মধ্যে জোতআতাউল্লাহ গ্রামের রঞ্জু মিয়া, বাবু শেখ, বারেক মিয়া এবং মনিরুজ্জামান পিয়া জোরপূর্বক চারটি অবৈধ ডিজেল নলকূপ স্থাপন করেছে। সরকারি সেচ নীতিমালা লংঘন করে শুধু গায়ের জোরে এসব করা হয়েছ। তারা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজেও বাধা দিচ্ছে। সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্কীম মালিক নাসরীন কামাল হয়রানি হচ্ছেন।

উপজেলা প্রশাসন গত ১০ ফেব্রুয়ারি ওই চার ডিজেল মেশিন মাঠ থেকে তিন দিনের মধ্যে অপসারণ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু ওই প্রভাবশালী মহল প্রশাসনের নির্দেশ কানে তোলেনি। এমতাবস্থায় উপজেলা প্রশাসন গত মার্চে অবৈধ ডিজেল মেশিন উচ্ছেদের জন্য টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করেন। জেলা প্রশাসক গত এপ্রিলে অবৈধ নলকূপ উচ্ছেদের জন্য একজন সহকারি কমিশনারকে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে নিয়োগ দেন।

নাসরীন কামাল জানান, ওই ম্যাজিস্ট্রেট কিছু আইনগত সমস্যার কথা বলে উচ্ছেদ অভিযানে কালক্ষেপন শুরু করেন। এক পর্যায়ে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। পরে স্থানীয় প্রশাসনের কালক্ষেপনে হতাশ নাসরীন কামাল গত ৫ জুন হাইকোর্টে একটি রীট করেন। রীটের প্রক্ষিতে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের নির্দেশে গোপালপুর উপজেলা সেচ কমিটি গত মঙ্গলবার (৯ আগস্ট) অভিযান চালিয়ে সবকটি ডিজেলচালিত সেচ মেশিন উচ্ছেদ করেন। অভিযানে নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারি কমিশনার রেজা মোহাম্মদ গোলাম মাসুম প্রধান।

পল্লী বিদ্যুৎ গোপালপুর জোনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানজার মাজহারুল ইসলাম জানান, সৌর সেচ প্রকল্পের জন্য গোপালপুর উপজেলায় ১২টি স্কীম লাইসেন্স পায়। কিন্তু প্রথমেই নাসরীন কামালের কাজে বিপত্তি পড়ায় সরকারের ভর্তুকি দেয়া সূদর প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।

বিএডিসির ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের স্থানীয় উপসহকারি প্রৌকশলী সবুজ মিয়া জানান, ভূগর্ভস্থ সেচ নীতিমালা ১৯৮৫ মোতাবেক একটি অগভীর নলকূপ থেক আরেকটির দূরত্ব থাকার কথা ৮২০ ফিট। আর সেই সেচ নীতিমালা মাঠ পর্যায়ে দেখভালের দায়িত্ব উপজেলা সেচ কমিটির।

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম আখতার হোসেন জানান, সুলভে সেচ নিশ্চিতের জন্য এডিবির অর্থায়নে বিপুল ভর্তুকিত সৌর সেচ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক নারী ক্ষমতায়নের লক্ষে কিস্তির মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদেরকে প্রকল্প অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তিনি আরোও জানান, সেচ মৌসুম শেষে এসব প্রকল্পে উৎপাদিত সৌর বিদ্যুৎ বিশেষ ব্যবস্থায় জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। ফলে গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রি করে স্কীম মালিকরা বাড়তি আয় করতে পারবেন।

নাসরীন কামাল অভিযোগ করেন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীদের সুলভ সেচের সুবিধার্থে পাঁচ লক্ষ টাকা ব্যয়ের সৌর প্যাকজ চালুতেই বাধা দিচ্ছে সরকারি দলের একটি মহল। তারা প্রধানমন্ত্রীর নারীবান্ধব প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা দিয়ে প্রকারন্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেই অবজ্ঞা করেছেন।

উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. পারভেজ মল্লিক জানান, প্রধানমন্ত্রীর সৌর সেচ প্রকল্পে যাতে কেউ বাধা দিতে না পারে সেজন্য প্রশাসন সজাগ রয়েছে। সরকারি সেচ নীতিমালা যথাযথভাবে দেখভাল হচ্ছে। প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।

মন্তব্য করুন -


Top
error: Content is protected !!