আজ || মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
শিরোনাম :
 


একাত্তরের ঈদ, আর হারিয়ে যাওয়া কাবুলীওয়ালা গোলাফ খানের কথা

::: অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন :::

ওই যে গোপালপুরের বৈরাণ নদী, একাত্তরে তার দুই তীরে কোনো সেতুবন্ধন ছিলনা। নদীতে ছিল বাঁশের চওড়া সাঁকো। সাঁকো না বলে চাঙ্গারী বলাই ভালো। কারণ হাজারো বাঁশ, তক্তা আর লোহার পেরেকে ঠাসা সেই প্রশস্ত সাঁকোতে আস্ত মেশিন গান আর ভারী মর্টার নদীর ওপারে ধাক্কিয়ে নিয়ে যেতো খান সেনারা।

বলছিলাম, রক্তাত্ব একাত্তর সালের কথা। গোপালপুরের বৈরাণ তীরের খান সেনাদের কথা। বীর মুক্তি যোদ্ধাদের কথা। একাত্তরের ২০ নভেম্বর শনিবার ছিল ঈদুল ফিতর। সেদিন পাকিস্তানী হানাদারে আক্রান্ত বাংলায় বাঙ্গালীর ঈদ ছিল নামে মাত্র।

ডিসেম্বরে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরুর দেড় সপ্তাহ আগে সারাদেশ জুড়ে মুক্তি বাহিনীর বড়সড় আক্রমণ দৃশ্যমান ছিল। বিশেষ করে, কাদেরীয়া বাহিনীর যোদ্ধারা প্রায় রাতেই গোপালপুর থানা শহর দখলে নিতে পাকিস্তানী হানাদারের উপর আক্রমণ চালাতেন।

এখন যে মৃতপ্রায় বৈরাণ, এর বামতীর বরাবর হাটবৈরাণ থেকে কীর্ত্তনখোলা পর্যন্ত তিন কিলো জুড়ে পাকা দুর্ভেদ্য ব্যাঙ্কার তৈরি করেছিলো খানসেনারা। বর্তমান থানা ছিল তাদের কর্মস্থল। তবে নন্দনপুরের খাদ্যগুদামেও তাদের বড় অংশ অবস্থান করতো।

১৯ নভেম্বর শুক্রবার ঈদের আগের রাতে মুক্তিযোদ্ধারা প্রচন্ড গোলাগুলি করেন হানাদারের ব্যাঙ্কারে। পরদিন শনিবার ঈদ বিবেচনায়, হানাদার বাহিনী হয়তো ধরে নিয়েছিল ওইদিন মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করবেনা।

কিন্তু সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট দেশ মাতৃকার স্বাধীনতাই ছিল মহানব্রত। তাই ওই দিন সন্ধ্যা লাগার আগেই গোপালপুর থানা আক্রমণের জন্য গোপালপুর-ঝাওয়াইল সড়কের ভূয়ারপাড়া এলাকায় পজিশন নিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। আর অজান্তে এ পজিশনের ফাঁদে পড়ে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছিল আমাকে।

ঘটনাটি ছিল খুবই সাদামাটা। আমার বোন রহিমা আপার বিয়ে হয়েছিল গোপালপুর সন্নিকটবর্তী নবগ্রামে। তিনি কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মরনাপন্নদশায় পড়েন। তখন দেশে স্যালাইন সহজলভ্য ছিলনা। কবিরাজী ওষুধ ছিল ভরসা।

ঈদের দিন দুপুরে রহিমা আপাকে দেখতে নবগ্রাম গেলাম। বোনজামাই সমশের আলী জানালেন, গোপালপুর বাজারে আফগান কাবুলীওয়ালা গোলাফ খানের দোকানে কলেরার ওষুধ পাওয়া যায়। সুতরাং তিনি মাথায় টুপি ও গায়ে ফতুয়া চড়িয়ে ঘর থেকে দু’কদম এগিয়ে আবার ব্যাকফুটে আসেন। বলেন, শ্যালকধন, চলো কবিরাজ গোলাফ খানকে দেখিয়ে নিয়ে আসি।

বলা অনাবশ্যক, গোলাফ খান ছিলেন কমপক্ষে সাড়ে ৬ ফিট দীর্ঘ, ধবধবে ফর্সা এক আফগান কাবুলিওয়ালা। গোপালপুর, মধুপুর, ধনবাড়ীসহ টাঙ্গাইলের বিভিন্ন গ্রামগঞ্জ ও হাটবাজারে, পেস্তা, কিশমিস, হালুয়া, সালশা এবং কবিরাজী ও সাধনা ওষুধ বিকাতেন তিনি। এলাকায় যাদের বয়স এখন কমপক্ষে ৬০ বছর তারা হয়তো, কাবুলী গোলাফ খানের কথা মনে করতে পারবেন।

গোলাফ খানকে ভেঙ্গুলা, নলিন ও কোনাবাড়ী হাটে বহুবার দেখেছি বলা সত্বেও, সমশের ভাই না শোনেননি। অগত্যা সাথে যেতেই হলো। বাড়ীর সামনের খাল পার হয়ে গোপালপুরের রাস্তা না ধরে, নবগ্রাম নাপিত পাড়ার দিকে হনহনিয়ে রওনা হন তিনি।

পাড়ার এক বাড়িতে গিয়ে, পুলক নামক এক নরসুন্দরকে ডেকে, আমার লম্বা চুলের সদ্গতির নির্দেশ দিলেন। মাথা ন্যাড়াদশার পর আমাকে সাথে নিয়ে গোপালপুরের দিকে হাটা দিলেন। বললেন, শ্যালক, তোমার লম্বা চুল দেখে পাকিস্তানী মিলিটারী ও রাজাকাররা হিন্দু ঠাউরাবে। তখন নিশ্চিত বন্দুকের নলে ঠেলে দেবে তোমাকে।

নবগ্রাম থেকে পায়ে হেটে বিশ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম বৈরাণ তীরে। প্রশ্বস্ত সাঁকো পার হয়ে নদীর ওপারে থানা ঘাটে যেতেই সামনে রাজাকার চৌকি। চেকিংয়ে চোখাচোখি হলো, হাদিরার গোহাত্রা গ্রামের শফি উদ্দীন এবং মাহমুদপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের আবদুল্লাহর সাথে।

এ দুই রাজাকারই আমার পূর্ব পরিচিত। কিন্তু দুজনের সাথে একজন খানসেনা ডিউটিরত থাকায় তারা দুজনই না চেনার ভান করেন। স্বাধীনতার পর শফিউদ্দীন হাদিরা হাতেম আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং আবদুল্লাহ নাটোর সুগার মিলে জব করতেন।

যাই হোক, কোনাবাড়ী বাজারের গোলাফ খানের দাওয়াখানায় হাজির হয়ে দেখলাম তিনি দোকানে নেই। পাকিস্তানী কমান্ডার তাকে থানায় ডেকে পাঠিয়েছেন। অনেক ক্ষণ পর তিনি এলেন। ওষুধ নেয়া হলো।

এর মধ্যেই দোকানে হাজির হন চাতুটিয়া গ্রামের রাজাকার আব্দুল হাকিম এবং উত্তর পাথালিয়ার রাজাকার জয়নাল আবেদীন। (দুজনই এখনো জীবিত)। এরা জিজ্ঞাসা শুরু করলেন কেন এসেছি, কার কাছে এসেছি, হুমায়ুন বেঙ্গলের মুক্তিযোদ্ধারা এ দুই গ্রামে অবস্থান করেন কিনা ইত্যাদি।

বোনজামাই সমশের আলী দুই রাজাকারকে কোনোভাবে থামিয়ে হাতের মুঠোয় চাপকে ধরে আমাকে নিয়ে রওনা দেন। রাজাকার চৌকির পর সাঁকো পেরিয়ে নদীর এপার এসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।

বলা দরকার যে, এর কদিন পর কাবুলীওয়ালা গোলাফ খানকে পাকিস্তানী সেনারা গুলি করে হত্যা করেন। জন্মস্থান আফগানিস্তান ছেড়ে বাংলার মাটির মায়ায় কয়েক দশক ধরে বাস করেছেন গোলাফ খান এখানে বাস করেছেন।

একাত্তরে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে গোলাফ খান এদেশে হয়তো আটকে যান। অথবা ব্যবসাবানিজ্যিক কারণেও হয়তো আটকে থাকতে পারেন। কিন্তু কেন বা কি কারণে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাকে হত্যা করেছিল সেটি আজো অজানাই রয়ে গেছে। আমার এ লেখাটা যারা পড়ছেন, তাদের কারো যদি কাবুলীওয়ালা গোলাফ খান হত্যার ঘটনা বা কারণ জানা থেকে থাকে, তবে সেটি কমেন্টস বক্সে লিখলে বাধিত হবো।

যাই হোক, এপারে এসে ভয় কেটে যাওয়ার পর নবগ্রামের পথে হাটা ধরলাম। সন্ধ্যা নামতে তখনো বাকি। প্রায় এক কিলো হেটে ভূয়ারপাড়া কালা ঠাকুরের পুকুর পাড় আসার পর উচ্ছস্বরে হল্ট শব্দ শুনতে পেলাম। ভয়ে দু’জন দাড়িয়ে গেলাম।

কালো প্যান্ট, পীতরংয়ের জামা এবং কালো ক্যাপ পরা দুই সশস্ত্র যুবক আমাদের ঝাপড়ে ধরেন। তারপর ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে সড়কের দক্ষিণ প্রান্তে নামিয়ে পশ্চিম দিকে ঠেলে নিতে থাকেন। এখন যে ভূয়ারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তার আরো পশ্চিমে সড়ক থেকে মাদারজানি গ্রামের দিকে নেমে যাওয়া হালটের এক ঝোপের মধ্যে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে মাটিতে শুইয়ে দিলেন তারা।

সেখানে একজন তাগড়া জওয়ান, যার দাড়িগোঁফে নাকমুখ ঢাকা, তিনি কর্কশস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, তোরা কে, কোত্থেকে স্পাইগিরি করতে আসছিস? ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নিচু করেইছিলাম। এক পর্যায়ে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি তারা মিয়া কমান্ডার। সকলের পরিচিত আঙ্গুর তালুকদার কোম্পানির সহঃঅধিনায়ক “তারা মিয়া কমান্ডার”।

বোনজামাই সমশের আলী ভাই তারা মিয়া কমান্ডারকে চিনতেন। তিনি নানা পরিচয়ের সুত্রে বোঝাতে সক্ষম হন যে, কলেরার ওষুধ কেনার জন্যই শ্যালককে নিয়ে তিনি কোনাবাড়ী বাজারে গিয়েছিলেন। যাই হোক, দশ কথার পর তিনি আমাদের ছেড়ে দেন।

সেই ঈদের রাতে কিন্তু বীর মুক্তিযোদ্ধারা সারারাত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে হুমায়ুন বেঙ্গল কোম্পানি, আঙ্গুর তালুকদার কোম্পানি, কমান্ডার শামসুল আলম, কমান্ডার আরজু এবং তারা মিয়া কমান্ডার ছড়াও আরো দুতিনটি কোম্পানির বীর মুক্তিযোদ্ধারা গোপালপুরে যুদ্ধ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পার হচ্ছে। বীরমুক্তিযোদ্ধা তারা মিয়া কমান্ডার বয়সের ভারে রোগেশোকে এখন অনেকট্ জীবম্মৃত। আঙ্গুর হোসেন তালুকদার ও কমান্ডার আব্দুস সোবহান তুলা গত হয়েছেন।

কমান্ডার শামসুল আলম, আব্দুল কাদের তালুকদারসহ যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধারা এখনো বেঁচে আছেন, তারা হয়তো একাত্তরের সেই স্মরনীয় ঈদে যুদ্ধের ময়দানে জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ের স্মৃতির নিঁখুত বয়ান দিতে পারবেন।

দুই হাজার একুশ সালে এসে আজ শুক্রবারের ঈদুল ফিতরের উৎসবটা গৃহবন্দী ছিল মহামারি করোনার কারণে। আর একাত্তরের ঈদুল ফিতরের উৎসবের আমেজ ছিলনা পাকিস্তানী বর্বরদের গণহত্যা আর বিভীষিকার কারণে। একাত্তর আর একুশ। মাঝে কতোদিন চলে গেছে! তারা কমান্ডাররা চিরঞ্জীব। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা।
বিঃদ্রঃ ছবিতে তারা মিয়া কমান্ডার।

  • 314
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    314
    Shares

মন্তব্য করুন

কমেন্ট করেছে


Top
error: Content is protected !!