আজ || শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১
 


“মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি” – ড. নূরুন নবী

‘একুশে পদক’ প্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ড. নূরুন নবী ১৯৪৯ সালে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার খামারপাড়া গ্রামে এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমি তাকে সম্মানসূচক ‘ফেলোশিপ’ প্রদান করেন। ২০২০ সালে ভাষা ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পুরস্কার ‘একুশে পদক’ পান।

ড. নূরুন নবীর বড় পরিচয় তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত থাকাকালীন তিনি যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেয়া ছাড়াও তিনি ছিলেন যুদ্ধ পরিকল্পনাকারী ও বার্তাবাহক। মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় কমান্ডারদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা ছাড়াও তিনি ভারতীয় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্রের জোগান দিতেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়নে স্নাতক শেষ করে জাপানের কিয়ুশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি মলিকিউলার বায়োলজিতে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করেন। ড. নূরুন নবী পেশায় একজন বিজ্ঞানী। কোলগেট টোটালের অন্যতম আবিষ্কারক। তার পেটেন্টকৃত আবিস্কারের সংখ্যা ৫৫টি।

একাত্তুরের দুঃসাহসী এই মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের পটভুমিতে ইতিহাস সমৃদ্ধ দুঃসাহসিক অভিযান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা ইতিহাসকে তুলে ধরে রচনা করেছেন প্রায় অর্ধশত গ্রন্থ। যা দেশ ও বিদেশে খুবই পাঠকনন্দিত এবং ব্যাপক আলোচিত। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক প্রবাসী’ পত্রিকার তিনি সম্পাদক।

ড. নূরুন নবী একাধারে একজন সফল সংগঠক এবং দক্ষ রাজনীতিবীদ। আমেরিকার নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের প্লেইনবোরো টাউনশিপ কমিটির চারবারের নির্বাচিত কাউন্সিলম্যান। জনসেবায় বিশেষ ভূমিকা রাখায় তিনি বেশ কয়েকবার প্লেইনবোরো ডেমোক্রেটিক অর্গানাইজেশনের পুরস্কার লাভ করেন। আমেরিকার নিউইয়র্ক বইমেলাসহ বাংলাদেশ এবং নিউইয়র্কে শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক বিভিন্ন কর্মকান্ডে ড. নূরুন নবী ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণকালে ড. নূরুন নবী তার নিজ জন্মভূমি থেকে প্রকাশিত ‘গোপালপুরবার্তা২৪.কম’ এর সাথে একান্তে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। ভার্চুয়ালি তার সাক্ষাতকার নিয়েছেন, গোপালপুর বার্তার নির্বাহী সম্পাদক কে এম মিঠু।

গোপালপুর বার্তা :
দেশ এবং বিদেশের মাটিতে আপনার অনেকগুলো পরিচয়। কিন্তু কোন পরিচয়ে আপনি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন?

নূরুন নবী :
মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে আমি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। কারণ মুক্তিযুদ্ধ জাতির জীবনে একবারই আসে। বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের সাংগঠনিকভাবে সহযোগিতা করার। লাল-সবুজ পতাকার জন্য সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার।

গোপালপুর বার্তা :
‘ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ’ সাময়িকীতে আপনাকে কেন ‘ব্রেইন অব দি ফোর্স’ বলে বিবেচনা করে?

নূরুন নবী :
আমরা টাঙ্গাইলে হিট অ্যান্ড রান কায়দায় যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধ শুরুর দিকে মুক্তঞ্চল ধরে রাখার মতো আমাদের তেমন কোন সক্ষমতা ছিল না। কোথাও দ্রুততার সাথে অভিযান চালিয়ে আমরা চলে গেলেই, পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী সেই এলাকা এসে জনগণের উপর নির্মমভাবে নির্যাতন চালাতো। তাই আমাদের জন্য মুক্তঞ্চল ধরে রাখা খুবই জরুরী হয়ে পরে। আর এজন্য প্রয়োজনীয়তা দেখা প্রচুর গোলাবারুদ ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের। ওই সময় ভারত থেকে কোনও সাপ্লাই লাইনও ছিল না। তাই ভারত থেকে টাঙ্গাইলে অস্ত্র সংগ্রহের দায়িত্ব বর্তায় আমার উপর। স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন বুকে নিয়ে দেশের তরে জীবন উৎসর্গ করে, আমি তিনবার ভারতে গিয়ে ভারতীয় বাহিনীর জেনারেলদের সাথে আলোচনা করে ৪০টি নৌকা বোঝাই অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে আসি। এই কঠিন কাজগুলো পালন করতে আমাকে বারংবার নানামুখী প্রশ্নের জবাবদিহি করতে হয়েছিল। প্রচুর পরিশ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে আমি ভারতীয় জেনারেলদের আস্থা অর্জন করেছিলাম। আর ভারত থেকে বিভিন্নরকম অস্ত্র ও গোলাবারুদ আনাতে আমাদের মুক্তিবাহিনীদের মনোবল অনেকগুণ বেড়ে যায়। পরে ক্রমাগত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমরা জয় অর্জন করতে থাকি।

গোপালপুর বার্তা :
বিদেশে অবস্থান করে বাংলা ভাষা ও শিল্প সাহিত্যচর্চায় কতটুকু সফল বলে আপনি মনে করেন?

নূরুন নবী :
প্রবাসে সাহিত্যচর্চা করার যেমন সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে অনেক সুবিধা। প্রবাস জীবন অনেকটাই শৃঙ্খলাবদ্ধ। এতে লেখক তার নিজের মতো করে লেখালেখিতে মনোযোগী হতে পারে। প্রবাসে বই লেখার অন্যতম সমস্যা হলো হাতের কাছে তেমন রেফারেন্স বই না থাকা। ইন্টারনেটেও বাংলা রেফারেন্স বইয়ের অভাব। প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চা বাড়লেও প্রকাশিত বইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। এরমধ্যেও অনেক প্রবাসী লেখক জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার পাচ্ছেন। এটা ভালো দিক। তবে প্রবাসী লেখকদের লেখার মানের দিকে নজর দেওয়া উচিত।

গোপালপুর বার্তা :
আপনার প্রবাস জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন?

নূরুন নবী :
দেশের জন্য মন কাঁদলেও আমার প্রবাস জীবন ভালই কাটছে। আমি প্রবাসে থাকলেও আমার অনেক কর্মকান্ড দেশ নিয়ে। দেশের জন্য যেসব কাজ করছি, তা দেশে থাকলে হয়তো করতে পারতাম না।

গোপালপুর বার্তা :
আমেরিকায় বাংলা ভাষার চর্চা সম্পর্কে আপনার মত কী?

নূরুন নবী :
আমেরিকা বড় বড় শহরে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় বাংলা স্কুল চালু রয়েছে। সেখানে বাংলা ভাষা শেখা ছাড়াও শিক্ষার্থীরা বাংলা গান, নৃত্য বাদ্যযন্ত্রসহ বাংলাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যগত শিক্ষা গ্রহণ করছে। তবে এখানকার ছোট শহরগুলোতে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ কম বসবাস করায় সেখানে বাংলা ভাষার চর্চা তেমনটি লক্ষ্য করা যায় না। প্রবাসে বাংলা ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করা নির্ভর করে অনেকটাই বাবা মায়ের ইচ্ছার উপর। তবে প্রবাসের মাটিতে বাংলা পত্রিকাগুলো বাংলা ভাষা চর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

গোপালপুর বার্তা :
বাংলা ভাষায় হিন্দি ও ইংরেজির ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্য চর্চায় এটা কি ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে?

নূরুন নবী :
হিন্দি ও ইংরেজি বাংলা ভাষা চর্চায় প্রভাব ফেলবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ ভাষা একটি প্রবাহমান বিষয়। সময়ের সাথে এর বিবর্তন হয়। অন্য ভাষা থেকে শব্দ সংযোগ হয়ে ভাষা সমৃদ্ধ হয়। বর্তমানে আমরা গ্লোবাল ভিলেজে বাস করি। ভাষা ও সংস্কৃতি আদান প্রদান হতে বাধ্য। এটাকে রদ করা যাবে না। দূষণ বা সংমিশ্রণ যাই বলি না কেন, তা আপন গতিতেই চলবে।

গোপালপুর বার্তা :
কথা সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন- বাংলা ভাষা যদি ভবিষ্যতে টিকে তাহলে বাংলাদেশেই টিকবে। আপনার কি মনে হয়?

নূরুন নবী :
আমিও সেটা মনে করি। কারণ রক্ত দিয়ে আমরা বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। বাংলাদেশেই বাংলা ভাষা টিকে থাকবে এবং উৎকর্ষ লাভ করবে।

গোপালপুর বার্তা :
বাংলাদেশে মৌলাবাদীদের উত্থান নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ জানতে চাই।

নূরুন নবী :
বাংলাদেশে মৌলাবাদীদের উত্থানের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ১৯৭৫-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে বাংলাদেশকে একটি মিনি পাকিস্তান বানাতে চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের  পরাজিত শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে আর অন্য কোনও আদর্শ ব্যবহার করা কার্যকর হবে না। বিধায় ধর্মভীরু বাঙালিদেরকে ইসলামের নামে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কখনো ধর্মান্ধদের দখলে যাবে না। সেই পরিস্থিতি আসলে বাঙালিরা অবশ্যই রুখে দেবে।

গোপালপুর বার্তা :
ডিজিটাইজেশনের ফলে বই পড়ার প্রবণতা কমেছে। এই প্রবণতা বাড়াতে আপনার পরামর্শ কী?

নূরুন নবী :
ভিডিও গেম, ফেসবুক, আইপ্যাড, কিন্ডেল কখনও বই পড়ার বিকল্প হতে পারে না। একজন লেখককে অবশ্যই বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশুনা করতে হবে। বই পড়ুয়াদের সংখ্যা একটু কমেছে বটে। কিন্তু যারাই বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশুনা করবেন, তারাই ভালো লেখক হয়ে উঠবেন।

গোপালপুর বার্তা :
সাহিত্যের ভাষা কোনটা হওয়া উচিৎ- মুখের ভাষা নাকি আঞ্চলিক ভাষা?

নূরুন নবী :
আমি মনে করি, প্রমিত ভাষা বা আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্য রচনায় কোনও বাধা নেই। কিন্তু নজর রাখতে হবে কিভাবে ভাষাকে ব্যবহার করতে হবে। চরিত্রের উপর নির্ভর করবে কোন ভাষা ব্যবহৃত হবে।

গোপালপুর বার্তা :
একুশে পদক পাওয়া সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

নূরুন নবী :
রাষ্ট্রের এ ধরনের একটি পুরস্কার পওয়া অবশ্যই সম্মানের ও আনন্দের। আমি দায়বদ্ধতা থেকে লেখালেখি করি, পুরস্কারের জন্য নয়। আমার এই পুরস্কার শুধু আমার একার নয়, এটা প্রবাসী সব বাঙালির। ভালো কাজ করলে প্রবাসীরাও জাতীয় পুরস্কার পেতে পারে।

গোপালপুর বার্তা :
নিউইয়র্কে বইমেলা নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

নূরুন নবী :
গত ৩০ বছর ধরে নিউইয়র্কে বইমেলা চলে আসছে। এর গুরুত্ব অনেক। এই বইমেলা নিউইয়র্ক তথা উত্তর আমেরিকায় বাংলা সাহিত্য চর্চা, পাঠক সৃষ্টি এবং লেখক সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছে। দেশ বিদেশের লেখক ও পাঠকদেরকে মুখোমুখী করেছে। ভবিষ্যতে এই বইমেলা আরও উৎকর্ষ লাভ করবে।

গোপালপুর বার্তা :
আপনার প্রকাশতি ‘স্মৃতিময় নিপ্পন’ এবং ‘জাপানীদের চোখে বাঙালি বীর’ গ্রন্থ সম্পর্কে কিছু বলেন।

নূরুন নবী :
আমি দায়বদ্ধতা থেকে লেখক হয়েছি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু বিকৃতি নয়, এটাকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা শুরু হয়েছিল। আমি তখন ভাবলাম, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে আমি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি। আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার  ইতিহাস সৃষ্টি করেছি। আমি যদি আমার নিজের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করি, সেটা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। তাই আমি মুক্তিযুদ্ধের উপর আমার অভিজ্ঞতা লেখা শুরু করি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য আমি ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমির সম্মান সূচক ফেলোশিপ পেয়েছি এবং গত বছর একুশে পদক পেয়েছি। এবার বইমেলায় ‘জাপানিদের চোখে বাঙ্গালী বীর’ এবং ‘স্মৃতিময় নিপ্পন’ গ্রন্থ দুটোর পাশাপাশি আরও একটি বই ‘Bangabandhu and Turbulent Bangladesh’ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

গোপালপুর বার্তা :
আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য গোপালপুর বার্তা পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনার প্রতি শ্রদ্ধাসহ অফুরন্ত শুভকামনা রইলো।

নূরুন নবী :
ধন্যবাদ। সৃষ্টিকর্তার কাছে সবার মঙ্গল কামনা করছি। মহামারী করোনাভাইরাস থেকে আল্লাহ সবাই মুক্তি দিন।

  • 427
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    427
    Shares

মন্তব্য করুন

কমেন্ট করেছে


Top
error: Content is protected !!