আজ || শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১
 


আমাদের বিজয় : মৃত্যুর গহ্বরে পাকিস্থানি সেনা

:: মোঃ শামছুল আলম চৌধুরী ::

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলির একটি সময় শরতের শেষ অথবা হেমন্তের শুরু। স্বচক্ষে দেখা জামালপুর ব্রহ্মপুত্র এলাকায়। সেইসময় বাবা-মাসহ পরিবারের সবাই মিলে জামালপুর নান্দিনা সড়কের পাশে ব্রজাপুরে থাকতাম। সেদিন বেলা দ্বিপ্রহর। সঠিক দিন তারিখ খেয়াল নেই। চারদিকে ঝড়ো হাওয়া বইছিলো। এইসময় দুটো পাকিস্থানি লরি নান্দিনার দিক থেকে জামালপুর শহরে ঢুকছিল। হঠাৎ আমাদের বাসার সামনে একটি লরি বিকল হয়ে পড়ে। ড্রাইভার লরিটিকে সচল করার চেষ্টা করছিলো। আওয়াজ পেয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি, ত্রিপল দিয়ে লরিটি ঢাকা। এরই মধ্যে হঠাৎ দমকা হাওয়ায় ত্রিপল সরে যাওয়ায় ৬০-৬৫ জন পাকিস্থানি হায়েনাদের স্তূপীকৃত লাশ নজরে পড়ে। লাশগুলো থেকে তখনো রক্ত মেশানো পানি ঝরছিল। পড়ে শুনেছি আগের দিন জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের কোন এক যুদ্ধে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে এসকল পাকিস্থানি সেনাদের করুণ মৃত্যু হয়।

ঘটনার দিন প্রায় মধ্যাহ্নে, আমার সাড়ে চার বছরের ছোট ভাই রাজু হঠাৎ দৌড়ে রাস্তায় বের হয়। অবুঝ শিশু জয়বাংলা বলে চিৎকার করে উঠে আর তখনি পাহারারত পাকিস্থানি সৈন্য ওর দিকে অস্ত্র তাক করে। তা দেখে মা ওকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে। আমিও লরির দিকে অগ্রসর হই। মা ছোঁ মেরে ওকে নিয়ে বাসার ভিতর দৌড়ে জঙ্গলের দিকে ছুটলেন। এদিকে পাকিস্থানি সেনাও আমাদের পিছু নেয়। আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত সেই মুহূর্তে লরিটি সচল হয়ে হর্ণ বেজে উঠে। সৈনিক গাড়িতে উঠে চলে যায়। পাকিস্থানিদের লাশ আর অবুঝ শিশুর দিকে অস্ত্র তাক করার দৃশ্যটি আজো আমার স্মৃতিপটে অম্লান। বদর আর পাকিস্থানীদের যাতায়াত পথ ছিল এই বজ্রাপুর এলাকা। পরবর্তীতে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে আমরা আবাসস্থল মিয়া পাড়ায় স্থানান্তর করি।

আমি তখন সরকারী স্কুলের (বর্তমান জামালপুর জিলা স্কুল) নবম শ্রেণির ছাত্র। শ্রেণিকক্ষে আমি, শওকত, জলিল রফিক ও আর দুই তিনজন মিলে প্রায়ই টিফিন পিরিয়ডে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিভিন্ন প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড চালাতাম। কিন্তু এক পর্যায়ে পাকিস্থানিরা টের পেয়ে যায় যে এখানে কিছু সংখ্যক ছাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটা একটি দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড ছিল। তৎকালীন শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক মরহুম ইসমাইল হোসেন এবং শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ফয়েজ আহমেদ আমাদেরকে সতর্কার সাথে চলাফেরার নির্দেশ দেন এবং পাকিস্থানিরা আমাদের বিষয়টি ওয়াকেবফাল হয়েছে বলেও জানান।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের ৪ তারিখে সকাল থেকেই জামালপুরে মিত্র বাহিনীর বিমান আক্রমণ শুরু হয়। আলবদর রাজাকাররা মাইকে বিমান ভূপতিত করার মিথ্যা প্রচারণা চালায়। শহরজুড়ে থমথমে অবস্থা এরই সাথে দূর থেকে ভারী অস্ত্রের গোলা গুলির আওয়াজ। ৫ তারিখ মিয়া বাড়ির সামনে টেলিফোন এক্সচেঞ্জের পাশ দিয়ে গলি, সেখান থেকে উঁকি দিয়ে দেখলাম, জিপের ভিতর পাকিস্থানিরা সশস্ত্র অবস্থায় পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে। ৬ তারিখ দুপুরের পর থেকেই ব্রহ্মপুত্রের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে বীর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণ তীব্রতর হচ্ছিল। একটানা ‘‘শোঁ’’ শব্দ শুনলেই টের পেতাম আশেপাশে কোথাও শেল পড়বে এবং তা মুহূর্তের মধ্যেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হবে। সেদিন বিকেল থেকেই এই অবস্থা শুরু হলো। আমার মরহুম পিতা আব্দুস ছাত্তার চৌধুরী ছিলেন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে খাবারেরও অসুবিধা হবে। তাই ঘরে চাল ডাল ও শুকনো খাবারের সংস্থান করলেন। এরই মধ্যে শহরের মানুষ জামালপুর ছেড়ে নিরাপর আশ্রয়ে চলে যাচ্ছিল। বাবাও শহর ছাড়ার তাগাদা দিচ্ছিলেন। কিন্তু আমি পাকিস্থানিদের পরাজয় না দেখে কোথাও যাবো না বলে জেদ ধরছিলাম। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকেই ভারী অস্ত্রের ব্যবহার ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। ঘরের আসে-পাশে গোলার তীব্র আওয়াজ ও স্প্লিনটারের আঘাতের শব্দ অনবরত শুরু হয়। বাধ্য হয়েই ঘরের পাশের বাঙ্কারে সকলেই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য একে একে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিকট শব্দে গোলা বর্ষিত হয়। আমি ভাবলাম বাবা আর রাজু হয়তো আর বেঁচে নেই পড়ে শুনলাম বাবা ভেবেছিলেন আমি বেঁচে নেই। কারণ দুজনেই তখন ঘরে তালা দিয়ে বাঙ্কারে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বাঙ্কারে সারারাত বারুদের গন্ধে বিনিদ্র রজনী কাটালাম।

৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১, গত রাতের বিনিদ্র রজনী আর বারুদের গন্ধে একাকার হয়ে গোলাগুলির শব্দ কিছুটা কমলেই সূর্য উঠার আগেই সকলেই বাংকার থেকে বের হলাম। দেখলাম ঘরের সামনে টিউবওয়েলের প্ল্যাটফর্ম ভেঙ্গে চুরমার হয়েছে আর পাশের একটি ঘরের উপর শেল পড়ে চাল উড়ে নিচে গর্ত হয়ে গিয়েছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও তীব্রতা দেখে আমিও শেষ অব্দি শহর ছাড়ার পক্ষে চলে গেলাম।  চাল ডাল তেল শুকনো খাবার ইত্যাদি নিয়ে আমরা শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিলাম। মাঝি পাড়া নয়া পাড়া পার করে শেকের ভিটা পর্যন্ত যেতেই দেখলাম রাজাকার আলবদরেরা বিমর্ষ ও ভগ্নদশা অবস্থা নিয়ে শহরের দিকে ছুটে যাচ্ছে। শেকের ভিটা এলাকায় অল্পক্ষনের জন্য অবস্থান নিলাম। শরীরের কষ্ট লাঘব করতে মাথার উপর থেকে স্বজনদের বিশাল আকৃতির দলিল দস্তাবেজের ভারী বোঝা ও কাঁধে থাকা শিশুকে নীচে নামালাম। হঠাৎই তিন দিক থেকে তীব্র গুলির আওয়াজ শোনা গেল। আমরা আওয়াজের তীব্রতা কম গেলে স্থান ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে আবারো পথ চলা শুরু করলাম। শহরের অনেক লোক কাফেলা বদ্ধ হয়ে রশিদপুরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আচমকা ভারী মেশিন গানের ও কামানের গোলার শব্দ শুনে মনে হচ্ছিল আমার বাম পাশ থেকেই হচ্ছে। একটু থেমে আমন ক্ষেতে তাকিয়ে দেখি ভারতীয় বাহিনী আর মুক্তিবাহিনীরা ভারি অস্ত্রের গোলা গুলি ছুড়ছে। গোলাগুলি ছোড়ার দৃশ্যটি দেখে আমি ভাবছিলাম পাকিস্থানি হায়েনাদের দিন শেষ, খুশিতে দূর থেকেই হাততালি দিচ্ছিলাম। কোন একজন সৈনিক আমাকে চলে যেতে বারবার ইশারা করছিলো। প্রথমে আমি তা খেয়াল না করলেও বিষয়টি বাবার নজরে আসে। আচমকা আমাকে টান দিয়ে সরালেন যাতে গুলি না লাগে। আমরা আবার পথ চলা শুরু করলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝিনাই নদীর কাছে রশিদপুর এলাকার মুক্তাঞ্চলে পৌছালাম। সেখানে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ও বন্দি অবস্থায় কিছু রাজাকার আলবদরকেও দেখলাম। তখন বুঝলাম বিজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রায় দুপুরের দিকে আমরা ঝিনাই নদী পেরিয়ে ভাবকি প্রাইমারি স্কুলে আশ্রয় নিলাম। ওখান থেকে আমরা ভাবকির এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য রওনা হলাম। পথিমধ্যে সতীর্থ চন্দ্রার শওকত ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, সামনেই তাদের ক্যাম্প।

৮ ডিসেম্বর, ভোর বেলা শওকত এসে আমাকে ডাকাডাকি করে বাইরে নিয়ে যায়। এইসময়  আমার হাতে রাইফেল ও গ্রেনেড দিয়ে তার ব্যবহার শিখিয়ে দেয়। কিন্তু রাইফেলের ট্রিগারে চাপ দিতে মানা করে। সারাদিন তাদের সাথে বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যার দিকে আশ্রয়স্থলে ফিরে আসি। এইসময় জানতে পারি মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনী জামালপুর শহরের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। ৯ তারিখও শওকতের সাথে একইভাবে কেটে গেলো। এরই মধ্যে ভাবকি থেকে মিত্র বাহিনীর বিমান আক্রমণের কারণে দূর থেকে মিত্র বাহিনীর বিমান থেকে বোমা বর্ষণের ফলে সৃষ্ট অগ্নিকুণ্ডলী নজরে পড়ে। ১০ই ডিসেম্বরও শহরজুড়ে থমথমে ভাব। শুনলাম পাকিস্থানিদেরকে আত্মসমর্পণের জন্য তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। এই কারণে কিছু সময় যুদ্ধ বিরতি দেওয়া হয়।

১১ই ডিসেম্বর জানতে পেলাম, জামালপুর মুক্ত হয়েছে। ১২ তারিখ জামালপুর ফিরে এলাম। ফেরার পথে পাকিস্থানি সেনার লাশ পড়ে রয়েছে। লাশের উপরে মানুষের ঘৃণা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ চলছে। পথিমধ্যে তৎকালীন পাকিস্থানি সেনাদের ক্যাম্প পিটিআই যাওয়ার পথে জামালপুর- টাঙ্গাইল মহাসড়কের উপর গোলার আঘাতে ছিন্নবিন্ন হওয়া পাকিস্থানিদের ১১টি জীপ ও লরি নজরে পড়লো। একটি জীপের স্টিয়ারিং ধরা দুই হাতের কব্জি রয়েছে বাকি দেহ বিছিন্ন হয়ে অন্যত্র চলে গিয়েছে। পাকিস্থানি সেনাদের অনেক লাশ ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে ছিল। রাস্তার উপরে প্রায় এক হাটু পরিমান গুলির খালি খোসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। পিটিআই-এর ঢুকতেই দেখলাম পাকিস্থানিদের নাম রেজিমেন্ট প্লেট সম্বেলিত প্রায় কয়েকশ কবর। তাতে বুঝতে পারলাম হায়েনার দল সমুচিত শিক্ষা এই জামালপুরেই পেয়েছিল এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অনেকেই খতম হয়েছে। কিন্তু এই সকল বিষয় পরবর্তীতে আড়াল হয়ে যায়। এগুলো সংরক্ষণ করলে বুঝা যেত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে কত হাজার হাজার পাকিস্থানিদের প্রাণ দিতে হয়েছে যা দেখে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম বীরত্বের অনেক শাণিত ইতিহাস জানতে পারতো। যুদ্ধে মৃত পাকিস্থানিদের অনেকেরই কবর এই দেশেই ছিল কিন্তু কবরগুলো পরবর্তীতে আর সংরক্ষণ করা হয় নি। সংরক্ষণ করলে বর্তমান প্রজন্ম আরও বেশী বেশী উপলব্ধি করতে পারতো আমাদের বীরত্ব গাঁথা। জামালপুরে অবস্থিত পাকিস্থানি সেনাদের এই কবরের চিহ্ন মুছে পরবর্তীতে কোন এক সময় ধান চাষ করা হয়েছিল।

তাই এই কথা সত্য ও চির অম্লান যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে আজকের বাংলাদেশ এখন শুধুই উপলব্ধি ও জাগরণের আখ্যান।

লেখক পরিচিতি : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব এবং টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের বেড়াডাকুরী গ্রামের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারের গর্বিত সন্তান।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

কমেন্ট করেছে


Top
error: Content is protected !!