আজ || সোমবার, ০১ মার্চ ২০২১
শিরোনাম :
  সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের পিতা রাজ্জাক মাস্টারের দাফন সম্পন্ন       একুশে পদক প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক খানকে নাগরিক সংর্বধনা       শোক সংবাদ :: অধ্যাপক রেজাউল বারী জামালী       টাঙ্গাইলের শ্রেষ্ঠ উপজেলা হাসপাতাল গোপালপুর       গোপালপুরে নৌকার সমর্থকদের হাতে বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী নিহত       বিদ্রোহী নিয়ে বেকায়দায় আ’লীগ; সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কায় বিএনপি       গোপালপুরে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা তুলা কমান্ডার পাঠাগার’ উদ্বোধন       ‘একুশে পদক’ পাচ্ছেন টাঙ্গাইলের ফজলুর রহমান খান ফারুক       গোপালপুরে প্রধানমন্ত্রীর উপহার পেলেন ৬৮ ভূমিহীন পরিবার       গোপালপুর উপজেলা লেডিস ক্লাবের নবাগত সভাপতিকে সংবর্ধনা    
 


‘একুশে পদক’ পাচ্ছেন টাঙ্গাইলের ফজলুর রহমান খান ফারুক

গোপালপুর বার্তা ডেক্স :
বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে একুশে পদক পাচ্ছেন ২১ জন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন টাঙ্গাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান খান ফারুক।

একুশে পদক সংক্রান্ত সাব-কমিটির এক সভায় ২২০ জনের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মোট ৪৫ জনের নাম প্রাথমিকভাবে মনোনীত করা হয়। জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত বাছাই-যাচাই মন্ত্রিসভা কমিটি অবশেষে ২১ জনের নাম সুপারিশ করে। এই সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে বৃহস্পতিবার অনুমোদন দেয়া হয়।

টাঙ্গাইলের রাজনীতি, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ক্রীড়া, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ও সংস্কৃতি হিতৈষী উপাধিতে ভূষিত হয়ে আজ পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় আছেন ফজলুর রহমান খান ফারুক। মহান মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে তাঁর অসামান্য অবদান। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই ফজলুর রহমান খান ফারুক এবার মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরিতে একুশে পদক পাচ্ছেন।

ফজলুর রহমান খান ফারুক ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় সাক্ষী, বয়োকনিষ্ঠ সংসদ সদস্য, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের একজন। তিনি জেলা পরিষদের প্রশাসক-চেয়ারম্যান, সুবক্তা, ক্রীড়া সংগঠক।

ফজলুর রহমান খান ফারুক :
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ওয়ার্শি গ্রামে ১৯৪৪ সালের ১২ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন ফজলুর রহমান খান ফারুক। তার বাবার নাম আব্দুল হালিম খান ও মাতার নাম ইয়াকুতুন্নেছা। গ্রামের পাঠশালাতেই দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন তিনি। তারপর চলে আসেন টাঙ্গাইল শহরে। ভর্তি হন বিন্দুবাসিনী হাই স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে। মেট্রিক পাস করেন একই স্কুল থেকেই। স্কুলে পড়া অবস্থায় তিনি জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। ক্রীড়াক্ষেত্রেও ঝোঁক বেড়ে যায় অনেক। শৈশবে তবলা চর্চাও করেছেন। মেট্রিক পাস করার পর তিনি ভর্তি হন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। সেখানকার হোস্টেলেই থাকতেন তিনি। সেখান থেকে চলে এসে ভর্তি হন করটিয়া সা’দত কলেজে।

সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তার রয়েছে অসামান্য অবদান। এজন্য তিনি টাঙ্গাইলে ‘সংস্কৃতি হিতৈষী’ হিসেবে পরিচিত। অনেক স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তার ব্যাপক অবদান রয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের টাঙ্গাইল মহকুমা প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সাংবাদিকতার জগতে আলো ছড়িয়েছেন। এখন তিনি দৈনিক আজকের দেশবাসী পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক।

ফজলুর রহমান খান ফারুক একজন ক্রীড়ানুরাগী, একজন ক্রীড়া সংগঠক। একজন ক্রীড়াবিদও তিনি। ওয়াইএমএস ক্লাকের হয়ে এক সময় শহর মাতিয়েছেন। টাঙ্গাইলের ফুটবলকে জাগিয়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ফজলুর রহমান খান ফারুক টাঙ্গাইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য ছিলেন দীর্ঘ ২৫ বছর। ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট উপ-পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন ২৫ বছর। ক্রিকেট থেকে ২০০৮ সালে তিনি চলে আসেন ফুটবল এসোসিয়েশনে। এখানে সভাপতি হিসেবে যোগ দিয়ে এখন পর্যন্ত এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করছেন।

মুক্তিযুদ্ধ :
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যা ও ক্র্যাক ডাউনের পর টাঙ্গাইলে স্বাধীনতার পক্ষের সব দলের প্রতিনিধি নিয়ে গণমুক্তি পরিষদ গঠিত হয়। এ পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা বদিউজ্জামান খান এবং কালিহাতী থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ছিলেন আহ্বায়ক। ফজলুর রহমান খান ফারুক এর সদস্য ছিলেন।

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল পাকবাহিনী মির্জাপুরে প্রবেশ করবে বলে খবর পেয়ে গোড়ান-সাটিয়াচড়ার পূর্বদিকে খালি মাঠে দুটি পরিখা খনন করা হয়। ফজরের নামাজ শেষে একটি পরিখায় গিয়ে অবস্থান নেন ফজলুর রহমান খান। ভোরের আধো-আলোতে পাক হানাদার বাহিনীর বিরাট কনভয় সড়ক দিয়ে মির্জাপুরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পাকিস্তানিদের কনভয়টি গোড়ান-সাটিয়াচরায় পরিখার কাছে আসার পর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের এক পর্যায় সুবেদার আব্দুল আজিজ ফজলুর রহমান ফারুককে অনুরোধ করে বলেন, ‘আপনি জনপ্রতিনিধি, ভবিষ্যতে আপনাদের প্রয়োজন আছে, আপনি যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে সরে যান।’ তার অনুরোধে ফজলুর রহমান খান কিছুটা পেছনে সরে চলে আসেন। বেলা পৌনে দুইটার দিকে পাকিস্তানিরা সফল হয়। ফজলুর রহমান খান ফারুক চলে আসার কিছুক্ষণ পরই পাকিস্তানি বাহিনীর মেশিনগানের গুলিতে ওই সুবেদারের বুক ঝাঁজরা হয়ে যায়। অল্পের জন্য সেদিন বেঁচে যান ফজলুর রহমান খান ফারুক।

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধই হচ্ছে টাঙ্গাইলের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ। আর ফজলুর রহমান খান ফারুকই প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে টাঙ্গাইলের একমাত্র প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, যিনি বাঙ্কারে ইপিআর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে অবস্থান নিয়ে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন।

প্রতিরোধ যুদ্ধ শেষে ১৮ এপ্রিল শেরপুর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ঢালু সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকে পড়েন ফজলুর রহমান খান। পরবর্তীতে ১১ নং সেক্টরের তুরা মুক্তিবাহিনী ট্রেনিং সেন্টারে পলিটিক্যাল মটিভেটরের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নিজেও ভারতে অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের একজন হলেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন ফজলুর রহমান খান ফারুক।

রাজনীতি :
ষাটের দশকে প্রগতিশীল আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতির হাতেখড়ি হয় ফজলুর রহমান খান ফারুকের। ১৯৬০ সালে তিনি স্কুল ছাত্র। তখনই সম্পৃক্ত হন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে। তার দক্ষতা, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও নেতৃত্বের বলিষ্ঠতার কারণে মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯৬২ সালে তিনি মহকুমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তারপর থেকে রাজনীতিতে তার পরিধি ক্রমেই বাড়তে থাকে। অংশ নিতে থাকেন বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগকে। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন করেন। এজন্য তাকে কারাবরণ করতে হয়। এই আন্দোলনের কারণে একই সময় তাকে টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরের বছর ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ফজলুর রহমান খান ফারুক। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এই আন্দোলনের কারণেও তাকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় ফজলুর রহমান খানকে। তারপরের বছর ১১ দফা আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য গঠিত সর্বদলীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন তিনি।

১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন ফজলুর রহমান খান ফারুক। এজন্যও তাকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির পর আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাকের (শরীয়তপুরের) নেতৃত্বে ১৬ জন ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে যান। তরুণ নেতাদের বরাবরই বঙ্গবন্ধু প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তরুণ ও দক্ষ ছাত্রনেতা হিসেবে ফজলুর রহমান খান ফারুককেও ভীষণ স্নেহ করতেন।

১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে টাঙ্গাইল জেলার ১০৭টি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ গঠনে নেতৃত্ব দেন তিনি। একই বছর অনুষ্ঠিত টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মির্জাপুর থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে ফজলুর রহমান খান আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ সদস্য।

১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ী হন ফজলুর রহমান খান ফারুক। ১৯৮৪ সালে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে প্রথমবারের মতো জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তিনি। পরে যতবার কাউন্সিল হয়েছে, ততবারই তিনি এ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে তিনি টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে এখন পর্যন্ত দলের কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করছেন।

  • 237
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    237
    Shares

মন্তব্য করুন

কমেন্ট করেছে


Top
error: Content is protected !!