আজ || শনিবার, ১০ এপ্রিল ২০২১
শিরোনাম :
 


কুখ্যাত আলবদর কমান্ডার কোহিনূরের ফাঁসির দাবি

আমার ভাবনা আমার কলাম
বিস্মৃতনাম শহীদ বুদ্ধিজীবি মসলিম উদ্দীন
:: অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ::

মসলিম উদ্দীন মিয়া একজন শহীদ বুদ্ধিজীবি। আর মনিরুজ্জামান কোহিনূর একজন আলবদর কমান্ডার। একজন একাত্তরের শহীদ। তাই সকলের নিকট বরণীয়। আর আরেকজন একাত্তরের ঘাতক। তাই যুদ্ধাপরাধী হিসাবে সকলের নিকট ঘৃনিত। উভয়ের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নে। এ দুজনের কথা গোপালপুরের নতুন প্রজন্ম ভুলেই গেছেন। আর প্রবীণরা হয়তো স্মৃতি বিস্মৃত। এ দুজনকে নিয়েই আজকের আলোচনা, ইতিহাসের আকর খুঁজে বেড়ানো। গত সোমবার ১৪ ডিসেম্বর ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস। আর আগামীকাল বুধবার বিজয় দিবস। তাই দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিবসের মাঝের দিনে পঞ্চাশ বছর আগের এক বিস্মৃত ইতিহাস সকলের নিকট তুলে ধরতে চাই।

একাত্তর শুধু একটি সাল নয়। বিজয়ের চিহ্ণ আঁকা বাঙ্গালীর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ কীর্তিয়া। তাই অক্ষয় এর ইতিহাস। আর ইতিহাসের যারা মহানায়ক তাদেরই টিকে থাকার কথা ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু পরাজিতরাও যে সদম্ভে টিকে থাকেন আলবদর কমান্ডার মনিরুজ্জামান কোহিনূর তার প্রমাণ। পাকিস্তানী নাগরিকত্ব ত্যাগ করে কৌশলে বাংলাদেশী নাগরিকত্ব বাগিয়ে নিয়ে বাংলাদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এ যুদ্ধাপরাধী এ আলবদর কমান্ডার। দেশজুড়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলেও আলবদর কমান্ডার মনিরজ্জামান কোহিনূর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, একাত্তর সাল জুড়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। তবে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের আগে এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদরের সহযোগিতায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী মোটা দাগে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবি হত্যার নীলনকসা বাস্তবায়ন করেন। অবশ্য এমন হত্যাকান্ড যে শুধু ডিসেম্বরেই হয়েছে তা নয়। সারা বছরই দেশব্যাপি গণহত্যার সাথে বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডও ঘটেছে। একাত্তরের জুন মাসে গোপালপুরের এক বুদ্ধিজীবি এভাবেই নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার হন। পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে নানা রাজনৈতিক চড়াইউতরাই পেরিয়ে এমন হত্যাকান্ডের ঘটনা ও শহীদের নামধাম আজ বিস্তৃতপ্রায়।

শহীদ বুদ্ধিজীবি মসলিম উদ্দীন ১৯২৪ সালে গোপালপুর উপজেলার হাদিরা ইউনিয়নের কড়িয়াটা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতার নাম মোঃ গহের শেখ। ঝাওয়াইল মহারাণী হেমন্তকুমারী হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ভূঞাপুর ইব্রাহীম খাঁ কলেজ থেকে স্নাতক পাশের পর তিনি সরকারি চাকরি না নিয়ে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকতা পেশাকে ব্রত হিসাবে বেছে নেন। তিনি বিয়ে করেন গোলাবাড়ী গ্রামের খোদেজা বেগমকে। তার স্ত্রীও স্কুল টিচার ছিলেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলন এবং ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি এলাকায় সাধ্যমত ভূমিকা রাখেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ঝাওয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি। একই সাথে ঝাওয়াইল রাজকুমারী সুরেন্দ্রবালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বর্তমানে এটি গার্লস হাইস্কুল হিসাবে উন্নীত হয়েছে। চাকরি এবং রাজনীতির সুবাদে তিনি ঝাওয়াইল বাজারে বাসা নির্মাণ করে অবস্থান করতেন।

সত্তর সালে ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সম্পাদক হিসাবে তিনি তৎকালিন এমএনএ মরহুম হাতেম আলী তালুকদারের সাথে রাজনীতি এবং দেশ সেবার কাজে নিয়োজিত হন। তার স্ত্রী খোদেজা মুসলিম ছিলেন শিক্ষক এবং গোপালপুর থানা মহিলা লীগের সভানেত্রী। মে মাসে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হলে এলাকার বহু যুবককে মসলিম উদ্দীন মুক্তিযুদ্ধে যেতে সহযোগিতা করেন। অনেককে তিনি নিজের টাকায় নলিনবাজার ঘাট থেকে নৌকায় যমুনা পাড়ি দিয়ে ভারতে যেতে সহযোগিতা করেন। তার রাজনৈতিক কার্যকলাপ অনেকের কুনজরে পড়ে। বিশেষ করে তারই বন্ধু পুত্র বেড়াডাকুরি গ্রামের সবুর মাস্টারের পুত্র মনিরুজ্জামান কোহিনূর ক্ষিপ্ত ছিলেন। ইত্যবসরে কোহিনূর একাত্তরে আলবদর বাহিনীতে যোগ দিয়ে কমান্ডার হিসাবে টাঙ্গাইলে শহরে হানাদার বাহিনীর সাথে কর্মরত ছিলেন।

একাত্তর সালের ১৮ জুন মসলিম উদ্দীন ব্যক্তিগত কাজে টাঙ্গাইল শহরে গেলে গুপ্তচর মারফত খবর পৌঁছে যায় আলবদর কমান্ডার কোহিনূরের নিকট। শহরের কাজ চুপিসারে সেরে বাড়ী ফেরার জন্য টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ডে আসা মাত্র দুজন আলবদর তাকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যান। কয়েকমাস পর মুসলিম উদ্দীনের পরিবার জানতে পারেন, আলবদরা তাকে আটক করে আলবদর ক্যাম্পে কোহিনূরের নিকট নিয়ে যান। আর কোহিনূর তাকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেন। পরে নতুন ডিস্ট্রিকের বধ্য ভূমিতে তাকে হত্যা করা হয়। পরিবার মুসলিম উদ্দীনের লাশ আর কোন দিন ফিরে পাননি। স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় থেকে থেকে স্ত্রী খোদেজা ১৯৯৮ সালে পরপারে পাড়ি জমান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি থানা মহিলা আওয়ামীলীগের সাথে জড়িত ছিলেন। স্বামী হত্যার বিচার দেখার তার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী কোহিনূর ও তার সহযোগিদের বিচার দেখে যেতে পারেননি এ স্কুল শিক্ষিকা। তার উত্তরসূরিরা শহীদ মুসলিম হত্যার বিচার দেখে যেতে পারবে কিনা সেটি নিয়েও অনেক সংশয়। কারণ ঘাতক আলবদর কমান্ডার মনিরুজ্জামান কোহিনূর এখন অনেক অনেক প্রভাবশালী।

শহীদ বুদ্ধিজীবি মুসলিম উদ্দীনের কোন পুত্র সন্তান ছিলনা। তিনি দুই কন্যা সন্তানের জনক। এরা হলেন, ফিরোজা বেগম বেদনা এবং বিলকিস জাহান লুচি। ফিরোজা বেগম লুচির কন্যা জান্নাতুল ফেরদৌসি জানান, তার নানা মুসলিম উদ্দীন মাস্টার একজন শিক্ষকই শুধু ছিলেননা। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামীলীগের ত্যাগী নেতা ও কর্মী। তার আত্মত্যাগ তাকে মহান করেছে। ২০০০ সালে শেখ হাসিনা সরকার মসলিম উদ্দীনকে নিয়ে ২ টাকা মূল্যের স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করেন। তবে এলাকাবাসি তাকে ভুলে গেছেন। এটাই বড় আফসোসের বিষয়।

ফ্লাশ ব্যাক আলবদর কমান্ডার কোহিনূর :
অনুসন্ধানে দেখা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবি মসলিম উদ্দীন হত্যাকান্ডের মূল নায়ক মনিরজ্জামান কোহিনূরের বাড়ি ঝাওয়াইল ইউনিয়নের বেড়া ডাকুরি গ্রামে। তার বাবা সবুর মাষ্টার ছিলেন প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। করতেন মুসলিম লীগ। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী প্রিন্সপাল ইব্রাহীম খাঁর বাঘ মার্কা প্রতীকে এলাকায় কাজ করতেন সবুর মাস্টার। আর ঝাওয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি হিসাবে মসলিম উদ্দীন কাজ করতেন আওয়ামীলীগ প্রার্থী নৌকা প্রতীকের হাতেম আলী তালুকদারের পক্ষে। সবুর পুত্র কোহিনূর তখন কলেজ ছাত্র। বাবার সহকর্মী মসলিম উদ্দীনকে নির্বাচনে নৌকা প্রতীক রেখে বাঘ মার্কা প্রতীকে কাজের অনুরোধ জানান। কিন্তু মসলিম উদ্দীন তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন। নির্বাচনে মুসলিমলীগ প্রার্থী প্রিন্সপাল ইব্রাহীম খাঁ বিপুল ভোটে হেরে যান। সারা পূর্বপাকিস্তান জুড়ে বঙ্গবন্ধুর নৌকা একচেটিয়াভাবে জয় লাভ করেন। কিন্তু পাকিস্তানীরা নানা টালবাহানা করে বঙ্গবন্ধু তথা বাঙ্গালীকে ক্ষমতা না দেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এরপর নানা নাটকীয়তার পর পাকিস্তানী হায়েনারা একাত্তর সালের ২৫ মার্চ সমগ্র বাঙ্গালী জাতিকে নিধন করার অভিযানে নামেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। আর এ যুদ্ধে বাবা সবুর মাস্টারের নির্দেশে পুত্র কোহিনূর আলবদর বাহিনীতে যোগ দেন। হানাদার বাহিনীর নিকট প্রশিক্ষণ শেষে টাঙ্গাইল জেলা আলবদর বাহিনীর প্রধান হন কোহিনূর। লুটতরাজ, হত্যা ও নারী ধর্ষণের প্রতীক ছিলেন কোহিনূর। সবচেয়ে বড় পরিচয় কোহিনূর ছিলেন পিতা সবুর মাস্টরের সহকর্মী মসলিম উদ্দীন হত্যার মূল নায়ক।

নয় মাস যুদ্ধের পর একাত্তরের ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মুক্ত হওয়ার আগে আগে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে কোহিনূর ঢাকা গমন করেন। ১৬ ডিসেম্বর রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর প্রধান জেনারেল এ এ কে নিয়াজী ৯৩ হাজার পরাজিত খানসেনা নিয়ে মুক্তি ও মিত্র যৌথবাহিনীর নিকট রমনা রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পন করেন। আত্মসমর্পন করা এ ৯৩ হাজার খানসেনার মধ্যে আলবদর কমান্ডার কোহিনূর ছিলেন। বন্দী খান সেনাদের কোলকাতা হয়ে নেয়া হয় ভারতের মধ্য প্রদেশের জব্বলপুর কারাগারে। সেখানে ১৯৭৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তারা কারাবন্দী ছিলেন। কোহিনূরও পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে সেখানে বন্দী ছিলেন। এরপর ভারত-পাকিস্তান সম্পাদিত শিমলা চুক্তিনুযায়ী ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সেনা ভারতের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে নিজ দেশে ফিরে যান। তাদের সাথে কোহিনূরও পাকিস্তান গমন করেন। কারণ তখন বাংলাদেশে তার ফেরার কোন সুযোগ ছিলনা।

১৯৭৮ সাল নাগাদ কোহিনূর পাকিস্তানেই ছিলেন। পাকিস্তানী নাগরিকত্বও তিনি গ্রহণ করেন। এরপর কোহিনূর পাকিস্তানী নাগরিক পরিচয়ে জাপান যান। সেখানে দীর্ঘ দিন চাকুরির পর ২০০২ সালে বাংলাদেশী নাগরিকত্ব ম্যানেজ করে এদেশে ফেরেন। কোটি কোটি টাকার মালিক কোহিনূর নিজের নাম পাল্টে রাখেন মনিরুজ্জামান। কিন্তু গ্রামের সবাই তাকে চেনেন কোহিনূর নামে। মনিরুজ্জামান কোহিনূর বর্তমানে ঢাকার বেইলী রোডের এক আলীশান বাড়িতে থাকেন। নারায়নগঞ্জে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী ও শাড়িকাপড় প্রিন্টিং কারখানা রয়েছে। কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক শিল্পপতি মনিরুজ্জামান কোহিনূর এখন বিজিএম এর সদস্য। ঢাকার কেউ তাকে কোহিনূর নামে চেনেননা। চেনেন শিল্পপতি মনিরুজ্জামান নামে। এভাবেই বাপদাদার নাম পাল্টে আলবদর কমান্ডার যুদ্ধাপরাধী কোহিনূরও সেজেছেন মনিরুজ্জামান।

বেড়াডাকুরী গ্রামের বাসন্দিরা জানান, কোহিনূর বেশ কয়েকবার নিজ গ্রামে এসেছেন। স্থানীয় স্কুল ও মাদ্রাসায় কোহিনূর নামেই দানখয়রাত করেন। কোহিনূরের আরেক ভাই আব্দুল মতিন ছিলেন স্কুল টিচার। ছোট ভাই মহসীন ১৯৭৯ সালে গোপালপুর থানা ছাত্র শিবিরের সভাপতি ছিলেন। তিনি এখন মার্কিন প্রবাসী। তবে জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত। কোহিনূরের ছোট ভাই এনামুল হক এনা এরশাদ আমলে গোপালপুর কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ব্যানারে জিএস পদে নির্বাচন করেন। এরশাদ আমলে এনামুল প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। আরেক ভাই হাফিজুল ইসলাম বেশ কয়েকবার ঝাওয়াইল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। একাত্তরে হানাদার বাহিনীর পক্ষে গুপ্তচরগিরি করার অপরাধে তার বোন জামাই চাতুটিয়া গ্রামের মোকছেদ আলীকে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করে হত্যা করেন।

সরকার ২০২০ সালকে মুজিববর্ষ হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। তাই এবারের ডিসেম্বর মাসের তাৎপর্য একটু বেশি। আর বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এলেই সমগ্র জাতি একাত্তরের বীর শহীদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নানা মাত্রায় স্মরণ করেন। জানান পরম শ্রদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে দেশব্যাপি মৌলবাদীদের তান্ডব মোকাবেলা করে এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবি ও বিজয় দিবস পালন করতে যাচ্ছেন সরকার। তাই মসলিম উদ্দীনের মতো বুদ্ধিজীবি হত্যার সাথে জড়িত ও চিহ্ণিত একজন আলবদর কমান্ডারের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীর অভিযোগ আনয়ন এবং বিচার দাবি সময়োচিত ও যৌক্তিক বলে মনে করছেন অনেকেই।

ঝাওয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, মুজিব বর্ষেই কুখ্যাত আলবদর কোহিনূরের বিচার হওয়া চাই। এ বিচারের মাধ্যমে দেশ যেমন কলঙ্কমুক্ত হবে, তেমনি মসলিম উদ্দীনের মতো দেশপ্রেমিক ও শহীদ বুদ্ধিজীবির আত্মাও শান্তি পাবেন।

বেড়া ডাকুরী গ্রামের বাসিন্দা এবং সরকারের যুগ্মসচিব হিসাবে অবসরে শামসুল আলম চৌধুরী মসলিম উদ্দীন হত্যাকান্ডের ঘটনায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ঘটনার কয়েক দিন পর তিনি ঝাওয়াইল বাজারে গিয়ে খোদেজা মসলিমকে স্বামী হত্যার ঘটনায় বিলাপ করতে দেখেন এবং হত্যায় জড়িত কারো কারো নাম উল্লেখ করে আল্লাহর কাছে বিচার প্রার্থনা করতে দেখেন। তবে হত্যায় জড়িত কার কার নাম সেদিন খোদেজা মসলিম বলেছিলেন তা এখন স্মরণে আসছেনা। তবে এমন নির্মম ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুক তাদের শাস্তি দাবি করেন তিনি।

একাত্তরে ঝাওয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি, সাবেক ইউপি সদস্য এবং ছয়আনী পাড়া গ্রামের বাসিন্দা এখলাস উদ্দীন আহমেদ আক্কাস জানান, মসলিম ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সম্পাদক ছিলেন। তিনি দলের জন্য খুব খাটাখাটি করতেন। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমরা দুজন মিলে যুবকদের সংগঠিত করতাম। তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য ব্যবস্থা করাতাম। বেড়া ডাকুরীর বাসিন্দা স্কুল টিচার সবুর মাস্টার মুসলিমলীগ করতেন। তার পুত্র কোহিনূর সত্তর সালের নির্বাচনে বাবার সাথে মিলে মুসলিম লীগের প্রার্থী ইব্রাহীম খাঁর নির্বাচন করতেন। এসব নিয়েই সবুর পুত্র কোহিনূরের কোপানলে পড়েন মসলিম। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কোহিনূর আলবদর বাহিনীর কমান্ডার হন। মসলিম হত্যাকান্ডের পরপরই নানাসুত্রে খোঁজ খবর নিয়ে আমরা জেনেছিলাম, কোহিনূরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আওয়ামীলীগ নেতা এবং স্কুল শিক্ষক মসলিম উদ্দীন খুন হন। এলাকার প্রবীণরা সবাই জানেন কোহিনূর আলবদর ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল। এখন নাকি সে কোটি কোটি টাকার মালিক। নিজের নামও পাল্টিয়েছে। ৯৫ বছর বয়সের এ প্রবীণ মসলিম হত্যার দায়ে আলবদর কমান্ডার কোহিনূরের ফাঁসি দাবি করেন।

ঝাওয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি, ভেঙ্গুলা হাইস্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক এবং বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন বিএসসি জানান, আলবদর কমান্ডার কোহিনূর তার পাশের গ্রামের মানুষ। ছোট্রকাল থেকেই তাকে চিনি। নিজের নাম পাল্টিয়ে এখন মনিরুজ্জামান সাজলেও একাত্তরে তার কুকীর্তি কখনো ঢাকতে পারবেনা। আমরা এলাকাবাসিরা মসলিম মাস্টার হত্যার অভিযোগে আলবদর কমান্ডার কোহিনূরের ফাসি চাই।

গোপালপুর উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুস সোবহান তুলা জানান, কোহিনূরের মতো কুখ্যাত আলবদর পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে জাপান এবং সেখান থেকে বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে কিভাবে দেশে এলেন এবং এখন সদম্ভে অবস্থান করছেন তা তদন্ত করে দেখা দরকার। আমরা আলবদর কোহিনূরের গ্রেফতার এবং বিচার চাই।

গোপালপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবি মসলিম উদ্দীন হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত আলবদর কমান্ডার কোহিনূরের ফাঁসির দাবি জানিয়ে বলেন, বিষয়টি এতোদিন সবার অগোচরে ছিল। এবার সামনে এসেছে। ঘাতক কোহিনূরকে ফাঁসি দিলে দেশ কলঙ্কমুক্ত হবে।

স্থানীয় সাংসদ ছোট মনির জানান, আলবদর কমান্ডার এবং শহীদ বুদ্ধিজীবি মসলিম মাস্টারের হত্যাকারিকে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে। এজন্য যুদ্ধাপরাধী ট্রাইবুনালের সাথে যোগাযোগ করা হবে।

  • 161
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    161
    Shares

মন্তব্য করুন

কমেন্ট করেছে


Top
error: Content is protected !!