আজ || শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০
শিরোনাম :
  গোপালপুরে স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করলেন এসিল্যান্ড       গোপালপুরে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগের বিক্ষোভ       গোপালপুরের হেমনগর কলেজ মাঠে ফুটবল টুর্ণামেন্ট শুরু       মুজিববর্ষে মুজিবনগরে ‘বিডি টাইম্‌স নিউজ’র সম্মেলন       গোপালপুরে কর্মজীবী মা ও শিশুদেরকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা       বাহরাইনের প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে বাংলাদেশে আজ রাষ্ট্রীয় শোক       গোপালপুরে পদবী ও বেতন গ্রেড উন্নীতকরণের দাবিতে ১৫ দিনের কর্মবিরতি       গোপালপুরে ঘাতক ট্রাক কেড়ে নিল প্রধান শিক্ষকের প্রাণ       গোপালপুরে ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’ সেরা শিল্পী পলাশকে সংবর্ধনা       গোপালপুরে সুশাসনের জন্য নাগরিক ‘সুজন’ এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী    
 


গোপালপুরের ডাকুরীর “তালুকদার-চৌধুরী-দহলিজ”

অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন :
তেজী ঘোড়া টগবগ করে ছুটে চলছে। তাতে বসা এক পাঠান অশ্বারোহী। তাকে অনুস্মরণ করে পিছনে আছেন অপর চার অশ্বারোহী। সবাই তাগড়া জোঁয়ান।

পাঠানদের পূর্বপুরুষরা সুলতানী আমলে বাঙলা মুলুকে চাকরির খোঁজে এসেছিলেন। সুলতানী দরবারের কৃপায় ফৌজদার হিসাবে চাকরিও জুটেছিল তাদের। মুঘল এমনকি নবাবী অামলে এসব পাঠান ফৌজদাররা নাঙ্গা তলোয়ার হাতে ছুটে বেড়িয়েছেন যুদ্ধের ময়দানে।

ডাকুরীর চৌধুরী বাড়ির দহলিজ

ব্রিটিশ আমলে এদের চাকরি ও পেশার ধরণ বদলে যায়। তাদের উত্তরসূরিদের কারো কারো ফৌজদার পদের বদলে তালুকদার পদবী জোটে। অারবী ‘তালুক’ শব্দার্থ সম্পত্তি। অার ফারসীতে ‘দার’ শব্দার্থ মালিক। অর্থাৎ সম্পত্তির মালিক যিনি।

ব্রিটিশ রাজত্বে সারা বাঙলা অসংখ্য তালুকে বিভক্ত ছিল। অার এমন একটি তালুকের মালিক হয়ে দখল বুঝে নিতে ওই পাঠান অশ্বারোহী ছুটে চলছেন গন্তব্য।

তালুকদারগণ পরগনার তালুকে বাসরত রায়তদের নিকট থেকে ভূমি রাজস্ব অাদায় করতেন। শতকরা দশভাগ হারে কমিশন পেতেন তারা। অার যেসব তালুকদার বেশি বেশি রাজস্ব অাদায় করে দিতেন, তারা সরকারের নিকট থেকে ‘চৌধুরী’ উপাধি পেতেন।

এ গল্পের যিনি অশ্বারোহী, তিনি তেমনি একজন তালুকদার। নাম অামীর হোসেন তালুকদার। সূর্যাস্তের অাগেই তাকে বাঙলা মুলুকের পুন্ড্রবর্ধন থেকে পুকুরিয়া পরগনায় পৌঁছতে হবে। কেননা রাস্তায় চোর-তস্করদের দারুন উপদ্রব। তাছাড়া পাড়ি দিতে হবে স্রোতস্বীনি যমুনা।

অশ্ব ছুটছে তো ছুটছেই। কখনো জোরকদমে। কখনো ত্রিতালয়ে, কখনো ধীরালয়ে। সন্ধ্যার অাবছা অালোয় প্রধান অশ্বারোহী পুকুরিয়া পরগনার ডাকুরী নামক মৌজায় উপনীত হলেন। ডাকুরী মৌজার পশ্চিমে পাঁচ কিলো দূরে যমুনা। এক কিলো পূর্ব ঝিনাই এবং চর্তুদিকে খাল, বিল, জলাশয় ও কায়েমী ভূমি।

অশ্বারোহী ঘোড়া থেকে নেমে এক উঁচু ভিটেয় শিষ্যদের নিয়ে তাবু গাড়লেন। এর আগে আসা দুই শিষ্য সেখানকার ঝোপ জঙ্গল পরিস্কার করে রেখে ছিলেন। সঙ্গে অানা কাশ্মীরি গালিচার উপর নকঁশাদার জায়নামাজ বিছিয়ে আছরের নামাজ  অাদায় করলেন সকলে।

সারাদিনের অনবরত পথ চলায় খুবই ক্লান্ত ছিলেন অামীর হোসেন তালুকদার। তাই এশার নামাজ অাদায় করেই কাশ্মীরি গালিচায় গা এলিয়ে দিলেন। বেশ বেলা হবার পর তার ঘুম ভাঙ্গলো।

তাঁবু থেকে বেড়িয়ে চারদিকে তাকিয়ে শাপলা ফোটা বিলঝিল, সর্পিল নদী, প্রশ্বস্ত অাবাদী জমি অার সবুজ শ্যামালীমায় ঢাকা চতুর্পাশ দেখে পাঠান যুবকের হৃদয়ে একটা ভালোলাগার ঢেউ খেলে গেলো।

একবার তিনি অাকাশের দিকে অারেকবার নিজের প্রশ্বস্ত বুকের দিকে তাকিয়ে মনে মনে “আল্লাহ অাকবর” শব্দ উচ্চারণ করে শিনায় ফুঁ দিলেন। পাঠানরা এভাবে সৃষ্টিকর্তার নিকট সন্তষ্টি প্রকাশ করেন।

ব্রিটিশদের নিকট থেকে পাওয়া এই নতুন তালুকের মালিকানা তাকে দারুন সন্তষ্ট করলো। তারপর সেই ভিটায় তাবু ছেড়ে ঘর উঠলো। অয়োময় টিনের ঘর। একখান, দুখান, চারখান। সাথে দহলিজ।

চৌধুরী বাড়ির আঙ্গিনায় দৃষ্টিনন্দন প্রাচীন মসজিদ

অল্পদিন পরেই পুত্র গওহর মাহমুদ তালুকদার বগুড়া বা পুন্ড্রনগর ছেড়ে পুকুরিয়া পরগনার ডাকুরি মৌজায় হাজির হলেন। পাঠান জাতির বাপবেটা যেমন ছিলেন দীর্ঘাঙ্গী, তেমনি উন্নত নাসিকার ফর্সা ডগডগে চেহারার উত্তম পুরুষ।

এরপর দৃঢ়হাতে শুরু করলেন তালুকদারি। রায়তদের নিকট থেকে কর অাদায়ে কিছুটা ছাড় দিলেও নিয়মিত কর অাদায় ও পরিশোধ করায়, ময়মনসিংহ জেলার ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট খুবই সন্তষ্ট হন। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে সম্মানসূক ‘চৌধুরী’ পদবী দেয়ার জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ করেন।

ইতিমধ্যে অামীর হোসেন তালুকদার ও গওহর মাহমুদ তালুকদার পরপারে পাড়ি জমান। কিন্তু গওহর মাহমুদ তালুকদার সুনামের যে ভিত তৈরি করেন, সেটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান তারই পুত্রদ্বয় মোহাম্মদ অালী চৌধুরী ও অাব্দুস সোবহান চৌধুরী। তারা তালুকদার থেকে ‘চৌধুরী’ উপাধী লাভ করেন।

তদানিন্তন পুকুরিয়া পরগনার অন্তর্গত গোপালপুর, সরিষাবাড়ী, ধনবাড়ী ও ভূঞাপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ডাকুরী চৌধুরী পরিবারের তালুক।

পরবর্তীতে এই চৌধুরী পরিবার ও চৌধুরী বাড়ীকে ঘিরেই গড়ে উঠে, টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের মৌজা ডাকুরী ও বেড়াডাকুরী গ্রাম। যে ডাকুরি এখন সমৃদ্ধ একটি জনপদ।

মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর পুত্র হলেন মজিবর রহমান চৌধুরী। অার আব্দুস সোবহান চৌধুরীর পুত্র ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক চৌধুরী, অাব্দুস সাত্তার চৌধুরী, অাব্দুল হক চৌধুরী, অাব্দুল হাই চৌধুরী, অাব্দুল মতিন চৌধুরী ও খাদেজা চৌধুরাণী রুনু।

চৌধুরী বাড়ির কৃতিসন্তান সরকারের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব শামসুল আলম চৌধুরীর সাথে ডাকুরীর চৌধুরী বাড়িতে বিশিষ্ট প্রবীণ সাংবাদিক অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন। ফটো : কে এম মিঠু

সরকারের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব শামসুল আলম চৌধুরী হলেন অাব্দুস সোবহান চৌধুরী তরফের উত্তরসূরি। চেয়ারম্যান ফিরোজ চৌধুরী এবং বীমা কর্মকর্তা বাবুল চৌধুরী এ বংশের উত্তরসূরি।

চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা বৃটিশ অামল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত, টানা সত্তর বছর গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের প্রেসিডেন্ট ও চেয়ারম্যান ছিলেন।

এ চৌধুরী পরিবারটি এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়। এই পরিবারের সদস্যারা শিক্ষাবিস্তারে উদারহস্ত ছিলেন। দানখয়রাতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এ সভ্রান্ত পরিবারের সজ্জন আচরণ, শিক্ষাদীক্ষা, রসবোধ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে এলাকায় অনেক গল্প ও উপাখ্যান রয়েছে।

এই বাড়ির আঙ্গিনায় রয়েছে কড়িপাথর খচিত শতাব্দী প্রাচীন একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। শানবাঁধানো ঘাটের পুকুর। রয়েছে খিলান সমৃদ্ধ বাঙলো সদৃশ দহলিজ। সবই চৌধুরী বাড়ীর ঐতিহ্যবাহি স্থাপত্য।

পৌনে একশ বছর আগের এই দহলিজে চৌধুরীরা প্রজাদের সাথে মিলিত হতেন। তাছাড়া হাজারো ঘটনা ও নির্ঘন্টের সাক্ষীসহ অনেক ইতিহাসও বহন করছে এ দহলিজ।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দহলিজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ভান্ডার। চতুর্দিকে খাল বিলের ঘেরাটোপে থাকা চৌধুরী বাড়ীর এই দহলিজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ অাশ্রয়স্থল।

১৯৭১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সরিষাবাড়ী উপজেলার ফুলদহপাড়া আক্রমণ এবং গণহত্যা চালানোর পর ডাকুরীর এই চৌধুরী বাড়ী নাগাদ তারা পৌঁছে যায়।

ঐদিন এই দহলিজে গুদামজাত ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক সরঞ্জাম। বাড়ীর মালিক এবং সাহসী পাঠান আব্দুস সোবহান চৌধুরীর বুদ্ধিমত্তার দরুন, হানাদার বাহিনীর দল সেদিন চৌধুরী বাড়িতে প্রবেশ না করে চলে যান।

আর মাত্র ৫০ গজ অগ্রসর হলেই হানাদার বাহিনী ঐদিন দহলিজের কক্ষ ভর্তি বিপুল সামরিক সরঞ্জামের সন্ধান পেতেন। আর তেমনটি হলে চৌধুরী বাড়ী যেমন ম্যাসাকার হতো, তেমনি বাড়ীর সকলেই হায়েনাদের বধের শিকার হতেন।

মুক্তিযুদ্ধে দেশের ধনাঢ্য তালুকদার, প্রভাবশালী চৌধুরী, অপসৃয়মান জমিদার এবং শহুরের উচ্চ শিক্ষিত ও সভ্রান্ত মানুষরা খুব একটা অংশ নেননি। বরং সমাজের এমন অংশের প্রায় সবাই শ্রেণী চরিত্রের কারণে “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” পছন্দ করেছেন।

একাত্তরে বাংলার স্বাধীনতায় বেশিরভাগই সমাজের চাষাভূসা, মেথরমুচি, কৃষকশ্রমিক এবং নিন্ম ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ নিজেদের ভাগ্য বদলাতে, বড়সড়ো আকারে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এজন্য মহান মুক্তিযুদ্ধকে গণযুদ্ধও বলা যায়।

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের ডাকুরী গ্রামের চৌধুরী পরিবার, দেশের সমসাময়িক সামন্ত শ্রেণিভূক্ত হলেও একাত্তরের রাজনৈতিক বাস্তবতায় “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” থেকে সরে এসে “জয় বাংলা” শ্লোগানে সামিল হন।

মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিয়েও দেশমাতৃকার টানে এই চৌধুরী পরিবার জুগিয়েছেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার, নিরাপদ আশ্রয়। দিয়েছেন সাহস আর অনুপ্রেরণা।
“জিয়ো জিয়ো মুক্তিযোদ্ধা। জিয়ো জিয়ো মুক্তিযুদ্ধ।”

লেখক পরিচিত :
সভাপতি, গোপালপুর প্রেসক্লাব। সিনিয়র করোসপন্ডেন্ট, দৈনিক ইত্তেফাক। সম্পাদক, গোপালপুর বার্তা।

Comments

comments


Top
error: Content is protected !!