আজ || শনিবার, ১০ এপ্রিল ২০২১
শিরোনাম :
 


গোপালপুরের প্রধান সড়ক জবরদখল করে অবৈধ বাসস্ট্যান্ড

জয়নাল আবেদীন :
সোনালী ব্যাংক সিলেট শাখার কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান গত সোমবার বাস থেকে নেমে রিকসাভ্যানে চড়া মাত্র ঢাকা ফেরত একটি দ্রুতগামী বাস পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। তিনি ছিটকে পড়েন রাস্তায়। স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার নেয়ার পর তিনি গ্রামের বাড়ি যান। রাতে ব্যথা বাড়তে থাকলে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখান দেখা যায়, পায়ের দুই স্থানে শুধু জখম নয়, হাড়ও মচকে গেছে। প্রতিনিয়তই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে টাঙ্গাইলের গোপালপুর বাসষ্ট্যান্ডে। দুর্ঘটনার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজট।

সরজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, গত জুলাই মাসে স্থানীয় বাসষ্ট্যান্ডে বন্যার জল উঠার অজুহাতে পরিবহন মালিকরা দেড়শতাধিক বাস শহরে প্রবেশের প্রধান সড়কে নিয়ে রাখেন। পরে সেটিকেই নতুন বাসষ্ট্যান্ড করা হয়।

সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কমিটির সভাপতি অধ্যাপক বাণীতাষ চক্রবর্তী জানান, পরিবহন মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন এদের টিকি স্পর্শ করতে পারছে না। নাগরিক ভোগান্তি ঘটিয়ে সড়ক জবরদখল করে মাসের পর মাস পরিবহন ব্যবসা চালানোর নিন্দা জানান তিনি।

উপজেলা কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির আহবায়ক প্রকৌশলী কে এম গিয়াস উদ্দীন জানান, গত জুলাই মাসে বাসষ্ট্যান্ড বন্যা কবলিত হওয়ার অজুহাতে বাস মালিকরা শহরের প্রধান সড়কের উপর বাস-ট্রাক রাখা শুরু করেন। বন্যা কবে চলে গেছে। কিন্তু মালিকরা আর পুরনো বাসস্ট্যান্ডে ফিরে যায়নি। শহরের প্রধান সড়কের দু’পাশ দখল করে এখন তারা ব্যবসা করছেন। নন্দনপুর থেকে সমেশপুর পর্যন্ত সড়কের বাম পাশের লন জুড়ে সারিবদ্ধভাবে বাসট্রাক রাখছেন। আর ডানপাশের লন ঘুরিয়ে রং সাইড দিয়ে বাস চালাচ্ছেন। উভয় লনেই বাস চলায় ছোটখাটো যানবাহন এমনকি পথচারিরা জীবন হাতে নিয়ে যাতায়াত করেন।

সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুস সোবহান তুলা জানান, বাসষ্ট্যান্ড খালি রেখে প্রধান সড়ক জবরদখল এবং নাগরিকদের জিম্মী করে পরিবহন ব্যবসা চলছে। এ মাসে উপজেলা আইনশৃংখলা কমিটির সভায় সড়ক থেকে গাড়ি বাসস্ট্যান্ড ফিরিয়ে নেয়ার তাগিদ দেয়া হয়। কিন্তু মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় জবরদখলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি হচ্ছে বলে তার ধারনা।

ঝাওয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, গত ৭ অক্টাবর উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন ও সমন্বয় সভায় সড়ক থেকে বাস সরিয়ে নেয়ার আহবান জানানা হয়। পরিবহন মালিকরা ব্যবসা করবেন ভালো কথা। কিন্তু প্রকৃত বাসষ্ট্যান্ড রেখে শহরের প্রধান সড়ক দখল করে সেটিকে অবৈধ বাসষ্ট্যান্ড হিসাবে ব্যবহার অন্যায়। কিছু মালিক জবরদস্তি ব্যবসা করছেন বলে ওই সভায় অভিযোগ তোলা হয়।

হেমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রওশন খান আইয়ুব জানান, উপজেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটি এবং উপজেলা আইনশৃংখলা কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। স্থানীয় প্রশাসন পরিবহন মালিকদেরকে সড়ক থেকে বাস সরানোর কথাও বলেন। কিন্তু মালিক সমিতি কথা শোনেনি। ফলে মানুষের চরম ভোগান্তি হচ্ছে।

উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এবং মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হালিমুজ্জামান তালুকদার জানান, শহরের ব্যস্ততম সড়ক দখল করে পরিবহন ব্যবসা গায়ের জোরেই করা হচ্ছে। যারা ব্যবসা করবেন তারা লাভ বুঝবেন। সুতরাং তাদের বাসগাড়ি কোথায় রাখবেন সে ব্যবস্থা তাদেরকেই করতে হবে। তবে রাস্তা জবরদখল করে হাজারো মানুষকে নাকাল করে নিজের লাভালাভি বোঝা শুধু অন্যায় নয়, অপরাধ।

বাস মালিক সমিতির সম্পাদক এবং উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মুকুল জানান, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও এখানে সরকারি বাস টার্মিনাল নেই। এটি তাদের প্রধান দাবি। বন্যার কারণে সাময়িকভাবে সড়ক ব্যবহার হচ্ছে। বাণবর্ষা চলে গেল পুরনো বাসষ্ট্যান্ডে তারা ফিরে যাবেন।

বাস মালিক সমিতির সভাপতি এবং সিনিয়র আওয়ামীলীগ নেতা রহমাতুল কিবরিয়া বেলাল জানান, বন্যায় পুরনো বাসষ্ট্যান্ডটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে। জমি ভাড়া নিয়ে এ অস্থায়ী বাসস্ট্যান্ড চালানো হয়। সরকার নতুন বাসটার্মিনাল নির্মাণ না করে দেয়া পর্যন্ত অগত্যা সড়কেই বাস রাখা হচ্ছে। আশপাশের ধনবাড়ী, ভূঞাপুর ও ঘাটাইল উপজেলায় কোন বাসষ্ট্যান্ড নেই। সেখান সড়কের পাশেই বাস রাখা হয়। তাহলে আমরা সড়কে রাখলে দোষ কোথায়?

পৌর মেয়র রকিবুল হক ছানা জানান, নানা জটিলতায় নতুন বাসটার্মিনাল নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকারের বরাদ্দ দেয়া এক কোটি টাকা ইতিপূর্ব ফেরত গেছে। পেট্রোল পাম্পের নিকট বাসষ্ট্যান্ড করার জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের বরাদ্দকৃত জায়গায় সরকারি খাতের চালগম খরচ হলেও পরে সেটি বেদখল হয়ে যায়। বর্তমান বাসষ্ট্যান্ডের পাশেই একোয়ার করার মতো ৩৫ বিঘা জমি পতিত রয়েছে। কিন্তু বড় বাসটার্মিনাল করা নিয়ে নানামুখি লাভালাভি ও টানাপোড়ন থাকায় স্থায়ী বাসটার্মিনাল নির্মাণে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে রাস্তার উপর গাড়ি রেখে নাগরিকদের কষ্ট দেয়া উচিৎ নয়।

ওসি তদন্ত কাইয়ুম সিদ্দিকী জানান, রাস্তা জবরদখল নিয়ে পরিবহন ব্যবসা বেআইনী। গ্রীন সিগনাল পেলে প্রয়াোজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিকাশ বিশ্বাস জানান, যারা পরিবহন ব্যবসা করবেন তাদেরকে নিজ উদ্যোগেই বাসষ্ট্যান্ড করতে হবে। প্রশাসন সেখানে সাধ্যমত সাপোর্ট করতে পারে। উদ্ভুত সমস্যা নিরসনে আগামী বুধবার উপজেলা প্রশাসন আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন। সেখানে বিষয়টির ফয়সালা না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ছোট মনির জানান, জনদুর্ভোগ কখনোই সমর্থন যোগ্য নয়। একটি বাইপাশ রোড এবং নতুন বাসষ্ট্যান্ড করার চেষ্টা হচ্ছে। জমিও খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু সেটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। বাসটার্মিনাল নির্মাণে সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিকদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে জানান তিনি।

  • 853
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    853
    Shares

মন্তব্য করুন

কমেন্ট করেছে


Top
error: Content is protected !!