আজ || বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০
শিরোনাম :
  গোপালপুরে কলেজ ছাত্রীর বানোয়াট ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহারের দাবি       জননেতা হাতেম তালুকদারের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত       গোপালপুরে বানোয়াট ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন       গোপালপুরে যমুনা নদীতে ইলিশ সংরক্ষণে ভ্রাম্যমাণ অভিযান অব্যাহত       গোপালপুরবাসীর সাথে থানার নবাগত ওসির মতবিনিময়       গোপালপুর পৌর নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্রকে হঠাতে চান ইঞ্জিনিয়ার গিয়াস       ফলদার প্রাণপুরুষ শ্যামবাবুর ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ       গোপালপুরের প্রধান সড়ক জবরদখল করে অবৈধ বাসস্ট্যান্ড       গোপালপুরে দূর্গাপূঁজা উপলক্ষে মতবিনিময় সভা       গোপালপুরের ভাষা সৈনিক হযরত আলী আর নেই    
 


গোপালপুরের সাত মুক্তিযোদ্ধার দাবি দুই কিলোমিটার পাকা রাস্তা

কে এম মিঠু, গোপালপুর :
এক সাথেই সাতজনের স্কুলে পড়াশোনা। এক সাথে উনসত্তরের গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করা। এক সাথেই মহান মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে লাল-সবুজের বিজয় পতাকা মুড়িয়ে ঘরে ফেরা।
টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হাদিরা ইউনিয়নের কড়িয়াটা-দরবারপুর গ্রামের এ সাত মুক্তিযোদ্ধার সামান্য দাবি দুই কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণ না হওয়ায় খেদোক্তির যেন শেষ নেই।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ সাত সূর্য সন্তানের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হাদিরা ইউনিয়নের কড়িয়াটা-দরবারপুর গ্রামে। একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন কাদেরিয়া বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুন বেঙ্গল, বীর মুক্তিযোদ্ধা হেদায়েত হোসেন বাদশা, নূরুল ইসলাম, খলিলুর রহমান, আবুল কাশেম, মতিয়ার রহমান ও আব্দুল খালেক ভূইঁয়া। একমাত্র আব্দুল খালেক ভূইঁয়া ছাড়া সত্তরোর্ধ সবাই রোগেশোকে কোনভাবে এখনো বেঁচে আছেন।

মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম জানান, তিন দিকে বিল ও একদিকে খাল। এ খালবিল পেরিয়ে সর্পিল রাস্তা ঢুকেছে গ্রামে। সেটির বিস্তৃতি দরবারপুর পর্যন্ত। গ্রামের দেড়শ বছরের পুরনো এ মাটির রাস্তা নির্মাণ করেন হেমনগরের জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরী। রায়তের খাজনা আদায়ে জমিদারের নায়েব বাবুর ঘোড়ার গাড়ি চলাচলের উপযোগী করে বানানো এ মাটির রাস্তাটি এখনও গ্রামের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। কালপ্রবাহে ব্রিটিশরা চলে গেছে। জমিদারি প্রথা রদ হয়েছে। পাকিস্তানি উপনিবেশিক শাসনের ২৪ বছর গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর চলছে। কিন্তু সেই কাঁচা রাস্তা কাঁচাই রয়ে গেছে।

মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমান জানান, গোপালপুর উপজেলার সর্বশেষ প্রান্তে কড়িয়াটা গ্রাম। এর উত্তরে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী এবং উত্তর-পশ্চিমে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলা। গাঁয়ের লোকসংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। ব্রিটিশ রাজত্বে ফারায়জী আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল কড়িয়াটা। ফারায়জী নেতা হাজী শরীয়ত উল্লাহ ও দুদু মিয়ারা বহুবার এসেছেন এ গ্রামে। সাতচল্লিশে এ গ্রামের লোকেরা ‘হাতমে বিড়ি মুখমে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ শ্লোগানে অংশ নেন। পরবর্তীতে দেশের আর সবার মতোই পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদে নামেন। গ্রামে সাত যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। কিন্তু কেউ রাজাকার, আলবদর বা শান্তি কমিটিতে যোগ দেননি। গোপালপুর উপজেলা সদর ১৫ কিলোমিটার দূরের এ প্রত্যন্ত গ্রাম ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ঘাঁটি।

মুক্তিযোদ্ধা হেদায়েত হোসেন বাদশা জানান, একাত্তরে যে রাস্তা ধরে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করেছি সেই রাস্তা এখনো তেমনটিই রয়ে গেছে। কোন সরকারই রাস্তা পাকাকরণে মনোযোগ দেয়নি। গ্রামে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাদ্রাসা রয়েছে। এর একটিতে আবার ভোট কেন্দ্র। দুই কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁচা রাস্তাটি বর্ষাকালে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। হাটবাজারে যাওয়া-আসা, স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসায় গমন, অসুখে-বিসুখে উপজেলা হাসপাতালে যাতায়াত অনেক কষ্টের। পঞ্চাশ বছরে উন্নয়ন বলতে দারোগা বাড়ির খালে দেড় লক্ষ টাকার একটি কালভার্ট। সাত মুক্তিযোদ্ধারা মিলে রাস্তা পাকাকরণে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও এলজিইডির নিকট এক যুগ ধরে ধর্না দিয়ে আসছি। কিন্তু সবই অরণ্যে রোদন।

মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান জানান, সরকার দেশকে উন্নয়নের রোল মডেল বলে দাবি করছেন। এ কথার অনেকটা সত্যতাও হয়তো রয়েছে। কিন্তু দেশের উন্নয়নে যে বৈষম্য এবং সে উন্নয়ন যে অনেকটা নগরকেন্দ্রীক কড়িয়াটা গ্রামবাসীর বঞ্চনা সেটি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। গ্রামের কেউ হঠাৎ অসুস্থ হলে রাস্তার দুরবস্থায় ডাক্তার আসতে চায়না। কড়িয়াটা-দরবারপুর গ্রামে কোন হাসপাতাল নেই। আদিম যুগের মতো মালকোঁচা দিয়ে জলকাদা মাড়িয়ে গ্রামের দুই কিলো রাস্তা পেরুতে হয়। তারপর ১৫ কিলো দূরের উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাওয়া অতীব কষ্টের।
তিনি আরও জানান, আমরা আর ক’দিনইবা বাঁচবো। গ্রামের একমাত্র রাস্তাটি পাকাকরণে অন্তিম ইচ্ছা পূরণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হুমায়ুন বেঙ্গল জানান, বর্তমান সরকারের আমলে দেশে অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চারণভূমি কড়িয়াটা পুরোপুরি অবহেলিত।

সাবেক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুস সোবহান তুলা জানান, সুষম উন্নয়ন না হওয়ায় দেড়শ বছরের প্রাচীন জনপদ কড়িয়াটাবাসীরা আজ উপেক্ষিত। তাদের বঞ্চনা ও বেহালদশা খুবই পীড়াদায়ক।

হাদিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল কাদের তালুকদার জানান, তিনি উপনির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর চেয়ারম্যান হিসাবে এ গ্রামের প্রাচীন রাস্তায় গতবার তিন লাখ টাকার মাটি ফেলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় রাস্তা ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে। মাটি ফেলে কাঁচা রাস্তার সংস্কার অর্থের অপচয় মাত্র। রাস্তাটি পাকা হওয়া জরুরি। এটি পাকা হলে সাত মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম ইচ্ছা যেমন পূরণ হবে তেমনি আশপাশের দরবারপুর, পাঁচপোটল, ভেঙ্গুলা পূর্বপাড়া, কেরামজানি ও চাতুটিয়া গ্রামের মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে সুবিধা হবে।

গোপালপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ জানান, রাস্তাটি পাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় এমপি এটি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ছোট মনির জানান, এটি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। এ গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটি আগে কেন পাকাকরণ হয়নি তা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে চলতি অর্থ বছরের মধ্যেই সড়কটি পাকাকরণ হবে বলে তিনি জানান।

Comments

comments


Top
error: Content is protected !!