আজ || শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
শিরোনাম :
 


রাজাকার কমান্ডার ও কালো চশমার কেচ্ছা

✍ অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ✍

চশমা নাকে বসিয়ে দুই চোখের দৃষ্টি প্রসারণ বা সৌন্দর্য বৃদ্ধির কথা। কিন্তু তা যখন নাক থেকে চাদিতে নিয়ে রাখা হয়, তখন পুরনো দিনের কেচ্ছা মনে পড়ে যায়।

বাল্যে গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল রাজ কাচারির নায়েব বাতেন উল্লাহকে দেখতাম নাক-চোখের চশমা চাদিতে ঠেলে রাখতে। তিনি নাকি এ ফ্যাশানটি শিখেছিলেন, তদানিন্তন গোপালপুর থানার সিও বা সার্কেল অফিসার (এসিল্যান্ড পদমর্যাদার) রেফাত উল্লাহর নিকট। অার চতিলা গ্রামের পেয়াদা নাজের উল্লাহও এমন করে চশমা রাখতেন চাদিতে।

অাজ থেকে প্রায় ৬০ বছর অাগে চশমা চাদিতে ঠেকিয়ে ফ্যাশন করতেন- বাতেন উল্লাহ, রেফাত উল্লাহ ও নাজের উল্লাহরা। সেই উল্লাহদের যুগ কবে চলে গেছে।
রেফাত উল্লাহ জামালপুরে চাকরিকালে একাত্তরে পাকিস্তানী বর্বর বাহিনীর হাতে শহীদ হন।
বাতেন উল্লাহ মুসলিম লীগ পছন্দ করতেন। একাত্তরে সাধের পাকিস্তান রক্ষায় পীচ কমিটির সদস্য হন। জন্মস্থান ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায়। ঘর জামাই ঘাটাইলের সাগরদীঘির। পীচ কমিটির মিটিং শেষে টাঙ্গাইল থেকে ফেরার পথে ধলাপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের করতলগত হন। তারপর নাই হয়ে যান।
চতিলার নাজের উল্লাহ জিন্নার পাকিস্তান রক্ষায় রাজাকারে নাম লেখান। বেড়াডাকুরির মুসলিম লীগ নেতা সবুর মাস্টারের পুত্র কোহিনূরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। একাত্তরে কোহিনূর রাজাকার বাহিনীর লিডার হলে তার ডাকে সাড়া দেন নাজের উল্লাহ। ভর্তি হন রাজাকারে।

গোপালপুরের অনেক যুবককে কোহিনূর রাজাকারে ভর্তি করিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পলশিয়ার অাবুল হোসেন সর্দার, পলশিয়ার অাশরাফ (যিনি পরবর্তীতে মাদ্রাসায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক এবং গোপালপুর উপজেলা জামায়াতের অামীর ছিলেন), মাহমুদপুরের মহির উদ্দীন কুঠাল, মোঃ অাবদুল্লাহ, শামসুল হক মাস্টার, এবং অামার নিজ গ্রামের ফজলুল হকসহ (অরিজিনাল বাড়ি সরিষাবাড়ী উপজেলার ঢোলভিটি) অনেকেই।

স্বাধীনতার পর নাজের উল্লাহ ও ফজলুল হক পালিয়ে সিরাজগঞ্জে যান। যমুনা চরে বিয়েথা করে বসতি গাড়েন। ফজলূল হক বেঁচে অাছেন। নাজের উল্লাহ বহু অাগেই মারা গেছেন। মহির উদ্দীন কুঠাল ও অাবুল সর্দার একাত্তরের ১২ ডিসেম্বর কালিহাতীর যুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীর হাতে নিহত হন।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী সেনারা রমনা রেসকোর্স ময়দানে অাত্মসমর্পন করেন। পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোহিনূরের সুসম্পর্ক ছিল। অার কাদেরিয়া বাহিনী কোহিনূরের কুকীর্তির জন্য যারপরনাই ক্ষিপ্ত ছিলেন।

দেশ হানাদারমুক্ত হবার পর মুক্তিযোদ্ধারা কোহিনূরকে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা কোনোদিনই কোহিনূরের নাগাল পাননি। ৯৩ হাজার বর্বর পাকিস্তানী খান সেনা, যারা যৌথ বাহিনীর নিকট অাত্মসমর্পন করেছিলেন, তারাই কোহিনূরের প্রাণ রক্ষায় এগিয়ে অাসেন। সুকৌশলে পাকিস্তান অার্মির সদস্য পরিচয়ে তাকে সারেন্ডার করানো হয়। রাজাকার কমান্ডার কোহিনূর এভাবেই পাকিস্তানী সোলজার সেজে রেহাই পান।

তারপর। তারপর কোহিনূর পাকিস্তানী সেনাদের সাথেই ভারতের জেলখানায় বন্দী ছিলেন। এক পর্যায়ে পাকিস্তানী সেনারা ভারতের কারাগার থেকে মুক্তি পান।  তাদের সাথেই কোহিনূর চলে যান পাকিস্তানে।

কোহিনূর ছিলেন খুব চৌকস ও বুদ্ধিমান। পাকিস্তানে অবস্থান কালে তিনি বসে থাকেননি। খন্দকার মোশতাকের শাসনামলে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের কনফেডারেশন গড়ার জন্য, পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত যেসব বাঙ্গালী প্রাণপাত করছিলেন, কোহিনূর ছিলেন তাদের অন্যতম। সুযোগ পেলেই তিনি পাকিস্তানে রাজনৈতিক অাশ্রয়প্রাপ্ত পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী নূরুল অামীনের সাথেও দেখাসাক্ষাৎ করতেন। নূরুল অামীন ছিলেন বায়ান্ন সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ সরকারের মূখ্যমন্ত্রী। ভাষা অান্দোলনে ছাত্রদের বুকে গুলি চালানোর অভিযোগে যিনি বাঙ্গালীর নিকট ছিলেন  ধিকৃত ও ঘৃণিত।

১৯৭০ সালে নিখিল পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যাসেমব্লী নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সব অাসন অাওয়ামী লীগ লাভ করলেও ময়মনসিংহে নৌকার প্রার্থী রফিক উদ্দীন ভূইঁয়াকে পরাজিত করে পিডিবির নূরুল অামীন এম.এম.এ নির্বাচিত হন।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে নূরুল অামীন নির্লজ্জভাবে পশ্চিমাদের পদলেহন শুরু করেন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর গণহত্যাসহ সার্বিক কার্যক্রমকে তিনি সর্বান্তকরনে সমর্থন করেন।
ডিসেম্বরে বাঙ্গালীর বিজয় লাভের অাঁচ পেয়ে ধূর্ত শৃগালের মতো জান বাঁচাতে পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমান। মরার অাগ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতক নূরুল অামীন পাকিস্তানেই অবস্থান করেন। সাধের পাকিস্তানের মাটিতেই তাকে দাফন করা হয়।

এদিকে পাকিস্তানে বেশ  ক’বছর অবস্থানের পর রাজাকার মণি কোহিনূর জাপান চলে যান। দীর্ঘদিন সেখানেই জব করেন। বেশ  ক’বছর অাগে তিনি বাংলাদেশে ফেরেন। এখন ঢাকায় সেটেল্ট। অর্থবিত্তে বলশালী। রাজাকার মণি কোহিনূরের অপরাধ ও কুকর্ম অাজ ছাঁইচাপা পড়ে গেছে। গোপালপুরের নতুন প্রজন্ম দুর্ধর্ষ রাজাকার কোহিনূরের নামই হয়তো জানেন না।

কোহিনূরের ছোট ভাই মহসীন পানকাতা ইসলামীয়া হাইস্কুলে অামার সাথে পড়তেন। লজিং থাকতেন নিয়ামতপুর গ্রামের ফকির বাড়ীর মৌলভী অাবুল কাশেম ফকিরের বাড়ী। কাশেম ফকির ছিলেন অামার দূর সম্পর্কের মামা। তিনি রাজাকার ছিলেন।

একাত্তরে টাঙ্গাইল শহরে অবস্থানকালিন রাজাকার কমান্ডার কোহিনূরের নেতৃত্বে তিনিও পাকিস্তান রক্ষায় যুদ্ধ করেছেন। কাশেম মামার কাছেই শোনা সে গল্প; একাত্তরে টাঙ্গাইল শহরে রাজাকার লীডার কোহিনূরের নাকি খুব দাপট ছিল। দাপটের কারণ এক পাকিস্তানী ক্যাপ্টেনের সাথে বাড়তি  হৃদ্যতা।

সদ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রাজাকার ক্যাম্প দুজনে একই সাথে পরিদর্শনে যেতেন। ওই পাকি ক্যাপ্টেনের মতো তার চোখেও শোভা পেতো রঙিন গগলস। কখনো সখনো সেটি নাক থেকে চাদিতে উঠিয়ে প্রশিক্ষণরত রাজাকারদের সামনে শ্লোগান ধরতেন- ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ, কওমে রাজাকার পাইন্দাবাদ, হিন্দুস্তান মুর্দাবাদ।’

একাত্তর থেকে কাশেম ফকিরের সাথে কোহিনূরের এ সম্পর্ক সূত্রেই ফকির বাড়িতে লজিং ছিলেন ছোট ভাই মহসীন। কাশেম ফকির বেঁচে থাকতে এ নিয়ে বিস্তর গল্প শুনেছি। রাজাকারে যাওয়ায় তিনি অনুতপ্তও ছিলেন। ৭৪ সাল পর্যন্ত টানা অাড়াই বছর  দালাল অাইনে জেলে ছিলেন কাশেম মামা। অার কোহিনূরের অনুজ মহসীন গোপালপুর কলেজে গ্র্যাজুয়েশনের সময় ছাত্র শিবির করতেন। সালটা ১৯৭৮-৭৯

রাজাকার কমান্ডার কোহিনূরের বোন জামাই ছিলেন মোকছেদ অালী। মোকছেদ ছিলেন অামার গ্রাম চাতুটিয়ার বাসিন্দা। পেশায়  গোপালপুর থানা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের ভেন্ডার ও দলিল লেখক। একাত্তরের জুনের মাঝামাঝি কাদেরিয়া বাহিনীর যোদ্ধারা উন্নত অস্ত্রসস্ত্র ও প্রশিক্ষণের জন্য ইন্ডিয়া গমন করেন। সেসময় কিছু দিনের জন্য পুরো টাঙ্গাইল মুক্তিযোদ্ধা শূণ্য হয়ে পড়ে। তখন গ্রামগঞ্জে পীচ কমিটি অার রাজাকার-অালবদরের দাপট বেড়ে যায়।

সেই সময় মোকছেদ অালী টাঙ্গাইল যান। তার সুমুন্দীও রাজাকার কমান্ডার কোহিনূরের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ভগ্নীপতি মোকছেদকে কমান্ডার কোহিনূর একজোড়া রঙিন চশমা উপহার দেন। সেই রঙিন চশমা মোকছেদ  কখনো নাক থেকে নামাতেন না। হাটবাজার, অফিস-অাদালত অথবা ব্যক্তিগত কাজে যখন যেখানে যেতেন রঙিন চশমা অহর্নিশ নাসিকায় বসিয়ে রাখতেন।

কখনোসখনো এ চশমা চাদিতে রেখে হাঁটাচলা করতেন। এলাকায় সদর্পে বলে বেড়াতেন, ‘কমান্ডার কোহিনূর তাকে এ চশমা উপহার দিয়েছেন। এটি জয় বাংলার নাপাক চশমা নয়, খাটি পাকিস্তানী চশমা। একদম পাকসাফ চশমা।’ গ্রামগঞ্জে এ কথার ডালপালা ছড়িয়ে পড়লো। গল্পের নতুন পাতা গজালো। বলাবলি শুরু হলো, বাপের বেটা মোকছেদ এমন একখান পাক চশমা এনেছেন যেটি দিয়ে মক্কা ও মদীনা শরীফ দেখা যায়। পাকিস্তানের লাহোর দেখা যায়। এমনকি এ চশমা দিয়ে দেশবিদেশে গোপন বার্তা ও অানা-নেয়া করা যায়।

দিন দিন এ যাদুকরী চশমার গাজাখুরি গল্প যতোটা না বিস্তার ঘটলো, তারচে বেশি ছাড়িয়ে গেলো মোকছেদের অহঙ্কার ও দাম্বিকতা। অার সেই দাম্বিকতার জেরে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে প্রাণ হারান মোকছেদ। এবার সেই গল্পটা করা যাক।

সম্ভবত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে কাদেরীয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা অাবার দেশে এলেন। রণাঙ্গনে গেরিলা যুদ্ধ চাঙ্গা হলো। কাদেরীয়া বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুন বাঙ্গাল ভেঙ্গুলা বাজারে অাস্তানা গাড়েন। প্লাটুন কমান্ডার তোরাপ অালী শিকদার (বর্তমানে গোপালপুর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি) চাতুটিয়া প্রাইমারী স্কুলে অবস্থান নিলেন।

অামি তখন বয়সে তরুণ। দিনে পাঁচবার গোঁফে তা দিয়ে বেড়াই। লম্বা চুলে বেণী গাঁথি। কমান্ডার তোরাপ শিকদার একদিন ক্যাম্পে এসেই এলাকার লিস্টেট  স্বেচ্ছাসেবকদের তলব করেন। তার হুকুম খাবার চাই। অার ক্যাম্পে মিলিত হওয়া সড়কের দুরবর্তী মোড়ে রাতদিন চব্বিশ প্রহরে সিগন্যাল বসানো চাই।

মুক্তিযোদ্ধাদের সামান্য চাওয়ার সাথে কেউই দ্বিমত করতেন না। নাড়ির টানে মানুষ না খেয়েও তাদের মুখে সহাস্যে অন্ন তুলে দিতেন। হাদিরা ইউনিয়ন অাওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত এসএম ইব্রাহীম মৌলভী, প্রধান শিক্ষক প্রয়াত অানোয়ার হোসেন বিএসসি এবং হামিদ মাস্টারকে সাথে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাবার সওয়াল করলাম। চালডাল, তেলনুন, রান্না করা খাবার বা মুড়ি যা পাওয়া গেলো সবই জোগাড় হলো। ক্যাম্পে নিয়ে তা জমার  ব্যবস্থা হলো।

হুকুম তামিল করে দশগজ না অাসতেই ক্যাম্পের সশস্ত্র সেন্ট্রি হুইসেল বাজালেন। পুনরায় তলব। রাতে ভেঙ্গুলা-চাতুটিয়া রাস্তার কড়িয়াটা মোড়ে পাহারা চৌকিতে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার সাথে দুজন স্বেচ্ছাসেবক চাই।  অানোয়ার হোসেন বিএসসি এবং অামাকেই হুকুম দাতার পছন্দ। রাত নয়টায় ঝাওয়াইল গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মজনু মিয়াকে অামাদের সাথে সেন্ট্রির জন্য পাঠানো হলো।

কড়িয়াটা মোড়ে যাওয়ার পথে হাতের বামে চাতুটিয়া পশ্চিমপাড়া। এ গ্রামেই মোকছেদ মিয়ার বাড়ি। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মুক্তিযোদ্ধারা রাতের অন্ধকারে টর্চ ব্যবহার করতেন না। থ্রি নট থ্রি রাইফেল কাঁধে মজনু অাগে ছুঁটছেন, অামরা দুজন পিছে পিছে। কিছুদূর এগিয়েই বায়ে মোড় নেন। অাগেই বলা ছিল, শুধু ফলো। নো টক। নো কোশ্চেন। পাঁচ মিনিট হেঁটে পৌঁছলাম ছনে ছাওয়া এক বাড়ির অাঙ্গিনায়। এটি যে মোকছেদ অালীর বাড়ি সেটি বিলক্ষন জানা ছিল।

মজনু মিয়ার চৌচালা ছন ঘরের দরজায় জোরে টোকা দেন। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে এক মহিলা সাড়া দেন। কেরোসিনে জ্বালানো দোয়াত বা’হাতে নিয়ে ডানহাতে তিনি দরজা খোলেন। ঘোমটা দেয়া সত্বেও স্পষ্ট হলো তিনি মোকছেদ অালীর মা। এতো রাতে রাইফেল হাতে মজনুকে দেখে যে ভয় পেয়েছেন কাঁপা গলায় তা বোঝার বাকি রইলোনা।

মজনু সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন,
– মোকছেদ কোথায়?
– বাবা সেতো বাড়ি নাই।
– কোথায় গেছে?
– বেড়া ডাকুরি শ্বশুরবাড়ী।
-ফিরলে বলবেন ওর চশমা জোড়া যেন কাল চাতুটিয়া ক্যাম্পে ভালোয় ভালোয় জমা দেয়।

সারা রাত জেগে যোদ্ধা মজনুর সাথে কড়িয়াটা মোড়ে পাহারা দিলাম। ভূঁইয়াবাড়ির এ মোড়ের দুই পাশে ছিল গভীর জঙ্গল। ছোট রাস্তায় ছিল একহাটু কাঁদা। সাপ অার জীনভূতের ভয়ে সন্ধ্যার পর মানুষ কখনো এ পথু হতোনা। অথচ নিকস কালো রাতে ওই অাড়া বা জঙ্গলের একখন্ড শুকনো পীতরাজ কাঠে উপবেশন করে পুরো রাত নির্বাক, নির্ঘুম, নিরুদ্বেগে  কাটালাম। ভূতপেত্নী, সাপবিচ্ছু ছিল দূর অস্ত।

সকালে ডিউটি শেষে ক্যাম্পে ফেরার পথে সাহস সঞ্চয় করে মজনু সাবকে বললাম,
-ভাই যদি কিছু মনে না নেন তো একটা কথা বলি।
– বলুন।
– মোকছেদ সাবের চশমায় কি সত্যিই যাদুকরী শক্তি অাছে?
– চশমায় যাদু অাছে কি নেই সেটি বড় বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এক কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার এ চশমা দিয়েছেন। অার সেই চশমা দিয়ে মোকছেদ বাহাদুরি দেখাচ্ছেন। অার প্রশ্ন করার প্রয়োজন অনুভব করিনি।

এরপর এলো সেপ্টেম্বর। চতুর্দিকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সরব উপস্থিতি। সরিষাবাড়ী উপজেলার জগন্নাথগঞ্জ রেলওয়ে ঘাট থেকে  পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর এক বিশাল বহর ফুলদহ গ্রামে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর ভয়াবহ আক্রমণ  চালায়। অপ্রত্যাশিত অাক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে।

ডজনখানেক মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারায়। হানাদার বাহিনী অারো অাগুয়ান হয়ে গোপালপুর উপজেলার ভেঙ্গুলা বাজারে হামলা চালায়। পাট ব্যবসায় খ্যাত ভেঙ্গুলা বাজার অাগুনে ভস্মীভূত করা হয়। কয়েকজন নিন্মবর্গের হিন্দুকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পাকিরা দাবি করতেন তারা সাচ্চা মুসলমান। তাই ভেঙ্গুলা বাজার পুড়ে ছারখার করলেও সেখানকার গণিকালয় ছিল অক্ষত। হানাদারদের একদল যখন অগ্নি সংযোগ অার নরহত্যায় মচ্ছপে ছিল, তখন অন্যদল গণিকালয়ে ঢুকে রমণে লিপ্ত হয়। পাক স্থানের মুসলিম নামের এ নরপশুরা সেদিন এভাবেই সুদৃঢ় পাকা ইমানের পরিচয় দিয়েছিল।

সেদিন ভেঙ্গুলা বাজারে হুমায়ুন বেঙ্গলের ৮/১০ জন মুক্তিযোদ্ধাও অবস্থান করছিলেন। তারা পাকবাহিনীর অাক্রমণের প্রচন্ডতা দেখে ঝিনাই নদী পেরিয়ে পূর্ব পাড়ে পজিশন নেন। কিন্তু প্রচন্ড গোলাগুলিতে পিছপা হন। পরে বিক্ষিপ্তভাবে ধনবাড়ী উপজেলার পানকাতা ইসলামীয়া হাইস্কুল ক্যাম্পে গমণ করেন।

এ দলের মুক্তিযোদ্ধা শামছুল হক, যিনি সহকর্মীদের পোষাকপরিচ্ছদ ও হালকা জিনিসপত্র কাঁধে নিয়ে ভেঙ্গুলা থেকে পানকাতা ক্যাম্পে ফিরছিলেন, তার সাথে চাতুটিয়ার তেলিপাড়া মোড়ে দেখা হয় মোকছেদ অালীর।  নিরস্ত্র দেখে মোকছেদ অালী ওই মুক্তিযোদ্ধাকে খুব গালিগালাজ করেন। তোর বাবাদের সাথে যুদ্ধে না পেরে ভাগছিস। বাবাদের ঠ্যালায় এখন ভয়ে পালাচ্ছিস। ইত্যাদি ইত্যাদি।

ওই মুক্তিযোদ্ধা পানকাতা ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুন বাঙ্গালকে বিষয়টি অভিযোগ অাকারে জানান।  উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা কালো চশমার অাদ্যোপান্ত, রাজাকার কমান্ডার কোহিনূরের ভূমিকা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এমতাবস্থায় মোকছেদকে গুলি করে মৃত্যূদন্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ঘটনার পর দুদিন মোকছেদ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন। হয়তো মনে ভয় ঢুকেছিল। কিন্তু তৃতীয় দিন তিনি পাকড়াও হলেন। তারপর হাত ও চোখ বেঁধে তাকে ঝাওয়াইলের দিকে নিয়ে যেতে দেখা যায়।

গভীর রাতে তাকে নৌকায় তোলা হয়। নেয়া হয় অথৈ গরিল্লা বিলে। সেখানেই পর পর গুলিতে হত্যার রায় কার্যকর হয়। নিহত মোকছেদের সেই গোল্ডন ফ্রেমের কালো চশমা পরে মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়েছিল। কিন্তু সেই চশমা দিয়ে মক্কা, মদীনা, পাকিস্তান, লাহোর কিছুই দেখা যায়নি।

(কেচ্ছার অনেকটা দেখা, কিছুটা শোনা, অল্পটা গবেষণা)

লেখক পরিচিত :
সিনিয়র করোসপন্ডেন্ট, দৈনিক ইত্তেফাক। সভাপতি, গোপালপুর প্রেসক্লাব। সম্পাদক : www.gopalpurbarta24.com

Comments

comments


Top
error: Content is protected !!