আজ || শনিবার, ৩০ মে ২০২০
শিরোনাম :
  গোপালপুরে স্ত্রীকে আগুনে পুঁড়িয়ে হত্যাচেষ্টার মামলায় স্বামী গ্রেফতার       গোপালপুরে শিশু ধর্ষণ চেষ্টাকারীকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ       আজ ঈদের দিনে এছহাকের বাড়িতে শোকের মাতম       গোপালপুরের হেমনগরে আওয়ামীলীগ নেতার ঈদ উপহার বিতরণ       গোপালপুরে এমপি ছোট মনির কর্তৃক ১২০০ কর্মহীন শ্রমিকের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ       গোপালপুরে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উপলক্ষে ১৫০টি হতদরিদ্র পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ       গোপালপুরে মসজিদ প্রতি ৫০০০ টাকাসহ ইমাম-মুয়াজ্জিনকে এমপির ঈদ উপহার প্রদান       গোপালপুর ও মধুপুরে ৩০০ পরিবারে সহপাঠীদের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ       গোপালপুরে এসএসসি ৮৯ ব্যাচ কর্তৃক ৮০০ পরিবারে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ       গোপালপুরে ৩০০০ কর্মহীন শ্রমিকের মাঝে এমপি ছোট মনিরের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ    
 


পরপারে চলে গেলেন রানার নগেন বাগদী; কারো কিছু যায়-আসেনি

– অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন

জুনের প্রচন্ড গরম। এক রত্তি বাতাসের দেখা নেই। বেলা গড়ানোর অাগেই রোঁদ তাঁতিয়ে উঠেছে। অাকাশ থেকে দলকা পাঁকিয়ে নামছে অাগুনের হলকা।

সেই মুখপোড়া দুপুরে কৃষ্ণকায়, ছিপছিপে ও দীর্ঘকায় মানুষটি অামার উঠোনে ধারালো কুড়ালে ঠাঁস শব্দে অবিরাম লাকড়ি চিরাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর ঘামেগতরে একাকার হলে পরনের ময়লা, তেল চিটেচিটে শতচ্ছিন্ন লুঙ্গি একহাতে টেনে কপাল, মুখ ও নাক মুচ্ছিলেন।

গিন্নী বিশ টাকার চুক্তিতে, ঝড়ে ভাঙ্গা অামগাছের বড় সাইজের ডাল, তাকে লাকড়ি বানাতে দিয়েছিলেন। অার অাগুন ঝরা দিনের সাথে পাল্লা দিয়ে, দৈত্যকায় কুড়ালে, লাকড়ির চেলা বানাতে মেতেছিলেন লোকটি। অবশ্য এ মাতামাতি সখে নয়, পেটের দায়ে।

বলছিলাম, নগেন বাগদীর কথা। অাশির দশকের প্রথম দিকে এক দুপুরে ছোট্র ঘটনার কথা। একে ঘটনা না বলে ছবি বলবো। কারণ নগেনদের বিড়ম্বিত জীবনের প্রাত্যহিক ঘটনায় কোনো গল্প হয়না। গল্প থাকেনা।

তাদের জীবনটা দুঃখকষ্টের অাস্ত নির্বাক ছবি। কেউ হয়তো তাতে একপলক নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকায়। কিন্তু চোখের পাতা না মিলাতেই সেই ছবি ধূসর ও ঝাঁপসা হয়ে যায়। তাই নগেনদের বিবর্ণ ও পানসে ছবি সমাজের বারোয়ারী এ্যালবামে কখনো ঠাঁই পায়না।

যাই হোক, নগেনের কথায় ফিরে অাসি। নগেনের বাড়ি ছিল টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল গ্রামে। অারো সহজে যদি বলি, নগেনের ঠিকানা ছিল বাগদী পাড়ার পলিথিনে ছাঁওয়া জীর্ণ কুটির। জাতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি। পরিচয়ে অচ্ছুত, ছোটজাত।

নগেনের কথা কখনোই অক্ষরের সমষ্টিতে বিমূর্ত করতাম না, যদি না তিনি মারা যেতেন। কারণ বেঁচে থাকতে নগেনদের যে বাঁচার লড়াই ছিল, সেটি ছিল এক মহা বঞ্চনার লড়াই, পরিচয় সংকটের লড়াই, বৈষম্যপূর্ণ সমাজের বিরুদ্ধে অসংগতির লড়াই।

নগেনের জন্ম ১৯৩৮ সালে। বাবা তুফান বাগদী। স্ত্রী পাহেলী বাগদী। হাফ ডজন কণ্যা সন্তান নগেনের। বাড়ি ভিটেও খাস জমিতে। পৈত্রিক পেশা ছিল স্থানীয় জমিদারের পালকি বাহক। যৌবনে পা রেখেই নগেন ১৯৫৪ সালের জানুয়ারী মাসে ডাকবিভাগের রাণার হিসাবে যোগ নেন।

গত বুধবার ১৬ জানুয়ারী ২০২০, এর দুপুরে পরপারে পাড়ি দেয়ার অাগ পর্যন্ত নগেন রাণার হিসাবে কাজ করে গেছেন। এটিকে যদি চাকরি বলা হয়, তাহলে এর ব্যাপ্তিকাল ছেষট্রি বছর। কতোটা দিন পার হলে ছেষট্রি বছর হয়, তার হিসাব কেউ রাখেনি। মাসে চার টাকার যে চাকরি জুটেছিল, মরণের অাগে তা এগারোশোয় উন্নীত হয়েছিল।
নগেনকে এতো বচন উৎসর্গের কারণ যদি ব্যাখা করি তাহলে বলতেই হয়, ১৯৬১ সালে অামি যখন খোকাবাবু, যখন শ্লেট অার বই নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনাগমন করি, তখন থেকেই চেনা শুরু নগেনকে।

গ্রামের নদীখাল অার কাঁদামাখা মেঠোপথ পেরিয়ে, ডাকের খাকী অাস্তরের ব্যাগ নিয়ে নগেন যেতো ঝাওয়াইল থেকে বাগুয়া। ঝড়বৃষ্টি, বর্ষাপ্লাবণ তুচ্ছ করে বাম কাঁধে ব্যাগ অার ডান হাতে ধারালো ফলা উঁচিয়ে সামনে পথ মাড়াতো নগেন।

হাটার ছন্দে ডান হাতের সূঁচালো ফলার গুঙুর টুংটাং করে বাজঁতো। পথচারিরা অপলকে তাকিয়ে দেখতো। অার অামাদের মতো বাচাদের বলতো, ‘ওই দেখো রাণার যাচ্ছে, নগেন রাণার।’

এভাবেই নগেন প্রায় টানা সাত দশক গন্তব্যে ছুটেছেন। চিরতরে পাড়ি দেয়ার দিনও গন্তব্যে পৌঁছেছিলেন। কাঁধের ব্যাগ অফিসে রেখে বুকে ব্যাথা চিনচিনে অনুভব করেন। তারপর ঢলে পড়েন মৃত্যূর কোলে।

নগেনের ছিল রাবনের গোষ্ঠি। সামান্য বেতনে ৮ সদস্যের পরিবারে হাভাত কাটেনি। তার রাণার চাকরি ও কোনোদিন স্থায়ী হয়নি। প্রচলিত নিয়মে কখনো হয় ও না। তাই অনটন রুখতে গ্রামে গ্রামে ঘুরে গৃহস্তের লাকড়ি চিরাতেন নগেন।

২০১২ সালের ঝড়ে তার জীর্ন কুটীর কুপোপাত হয়। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্মরণাপন্ন হন নগেন। কিন্তু কোনো সাহায্য জোটেনি। স্ত্রী চলে যায় মেয়ের বাড়ি। অার নগেনের ঠিকানা হয় ঝাওয়াইল পোস্ট অফিসের বারান্দা। সেখানেই কাটে জীবনের শেষ অাট বছর।

নগেনের দুরবস্থা পত্রপত্রিকায় তুলে ধরার খুব তাগিদ অনুভব করছিলাম। ২০১৬ সালে তার জীবন সংগ্রাম নিয়ে ছোট্র একটি স্টোরি দৈনিক ইত্তেফাকে পাঠালাম। কিন্তু সেটি ফেলে দেয়া হলো।

ভাবলাম নগেদ বাগদী তো ম্লেচ। তাই বর্ণাশ্রমী মফস্বল টেবিল হয়তো তাকে জাতে তুলতে চায়নি। পরবর্তীতে সেন্ট্রাল ডেক্সে পাঠালাম। ওখানে যারা কাজ করেন তারা পুরোটাই ব্রাম্মণ। শহুরেচোখা। তাই মফস্বলের অচ্ছুত নগেন তাদের ছুঁতে পারেনি।

শেষাবধি বহুচেষ্টায় মফস্বল সম্পাদক বারী সাবকে নগেনের দুঃখকষ্টের কথা বোঝালাম। ভেতরের পাতায় ছোট্র সচিত্র খবর ছাপা হলো। তাতেই কাজ হলো। অনেক হৃদয়বান ব্যক্তি সাড়া দিলেন।

এর মধ্যে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক ভদ্রলোক অামার ঠিকানায় নগেনের জন্য একলক্ষ টাকার চেক, পর্যাপ্ত গরম কাপড় পাঠালেন। তদানিন্তন ইউএনও মাসূমুর রহমানের উপস্থিতিতে তার অফিসকক্ষে অানুষ্ঠানিকভাবে নগেনের হাতে সেই চেক হস্তান্তর করেছিলাম।

চেক হাতে নিয়ে নগেন সেদিন সবার সামনে অানন্দাশ্রু বর্ষণ করেছিলেন। তার অানন্দাশ্রুতে অামিও সিক্ত হয়েছিলাম। সুখের অনুভূতিতে ভাগ বসিয়ে পরম সুখের ছোঁয়া পেয়েছিলাম।

অামার চার দশকের গ্রামীন সাংবাদিকতায় অনেক মধুর স্মৃতির এটি একটি। তাই নগেন বাগদীর চিরবিদায়ে বুকের গহীনে ব্যাথা অনুভব করেছি। সেই ব্যাথায় জাতপাতের বালাই ছিলোনা।

শেষ করতে চাই সুকান্তের কবিতা দিয়ে-

“রাণার, রাণার, ভোরতো হয়েছে

আকাশ হয়েছে লাল

আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে

এই দুঃখের কাল।”

রাণার নগেনদের দুঃখের কাল বেঁচে থাকতে কখনোই কাটেনা। কারণ মহাকাল হয়তো তাদের প্রতি নারাজ থাকেন, রুষ্ট থাকেন। তবুও অাশা অাগামী দিনের নগেনরা মানুষের মর্যাদা পাবেন, সম্মান পাবেন। পরপারে ভালো থেকো বন্ধু নগেন।

Comments

comments


Top
error: Content is protected !!