আজ || শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২০
শিরোনাম :
 


বিদায় শিউলির শরৎ, স্বাগত নবান্নের হেমন্ত -জিন্নাহ খান

শরৎকাল সমাপ্ত করে হেমন্তকে স্বাগত জানালো বাংলার প্রকৃতি।বাঙালীর জীবনযাপনে হেমন্ত এলো নবান্নের উৎসবের নিমন্ত্রণ নিয়ে। ভোজন রসিক বাঙালী পেট পুজোতে বিশ্ব সেরা। তাই ঋতুগুলোও যেন বাঙালীর চরিত্রের রন্ধ্রেরন্ধ্রে মিশে আছে।

শরতের সোনালী রোদ্দুরের ঝলমলে সকাল আর মেঘবিহীন পড়ন্ত বিকেল হতে সন্ধ্যা অবধি সুর্যটা আধডোবা পর্যন্ত টলটলে স্বচ্ছ সোনালী রোদে উঠতি বয়সে, স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বইগুলো টেবিলে রেখেই ফুটবল-টা বগলদাবা করে স্কুলমাঠে যেতাম। খালি গায়ে ইংলিশ প্যান্ট পড়ে সন্ধ্যার পর যতক্ষণ পর্যন্ত ফুটবলটা দেখা যেতো ততক্ষণ খেলা চালিয়ে যেতাম এবং সন্ধ্যা গোল দেয়ার পর বাড়ি ফিরতাম।

শরৎ এলেই, একটু বেশিই আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। বিশেষ করে সকালটাকে দেখে। প্রস্ফুটিত গোলাপের রঙে ডিম্বাকার কুসুমের ন্যায় সুর্যটা যখন অর্ধেক মাথা বের করে পৃথিবীতে উঁকি মারে, ঠিক তখন থেকে তেজদীপ্ত হওয়ার পুর্বমুহুর্ত পর্যন্ত শিশিরে ভেজা সোজা সুঁচালো প্রতিটি সবুজ ধানের পাতার ডগায়, একেকটি শিশির বিন্দুকে মনে হয় যেন হীরের নাকফুল। সোনামাখা রোদের সেই ঝলকানিটা কখনো ভোলার নয়। বেলগাড়ীর আস্তানাবাড়ি (সাকী বাবার মাজার প্রাঙ্গণ) বাগানের শিউলির ঘ্রানে ছুটে যেতাম শিউলিতলায় ফুল কুড়াতে। সেই শিউলি গাছটা আর নেই। শরতে বাতাসে তার গন্ধটা অনুভব ছাড়া আর ভাসে না। বিদায় শিউলি বিদায় শরৎ, আবার এসো ফিরে আমাদের মাঝে শিউলির ঘ্রাণ নিয়ে।

স্নিগ্ধতার শরৎ :

শরৎ বাংলাদেশের কোমল ঋতু। শরৎঋতুর রয়েছে স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের ছয়টি ঋতু ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন রূপের পসরা নিয়ে হাজির হয়। এক-এক ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন ফুলে ও ফলে , ফসলে ও সৌন্দর্যে সেজে ওঠে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো পৃথিবীর আর কোন দেশের প্রকৃতিতে ঋতুবৈচিত্র্যর এমন রূপ বোধ হয় নেই।

বর্ষাকন্যা অশ্রুসজল চোখে বিদায় নেয় শ্রাবণে। ভাদ্রের চোখে সূর্য মিষ্টি আলোর স্পর্শ নিয়ে প্রকৃতির কানে কানে ঘোষণা করে শরতের আগমন বার্তা। থেমে যায় বর্ষামেয়ের বুকের ভেতর দুঃখ মেঘের গুরুগুরু। ঝকঝকে নীল আকাশে শুভ্র মেঘ, ফুলের শোভা আর শস্যের শ্যামলতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে শরৎ। প্রকৃতির কন্ঠে কন্ঠে মিলিয়ে কবি এখন গেয়ে ওঠেন-

‘আজি ধানের খেতে রৌদ্র ছায়ায়

লুকোচুরির খেলা

নীল আকাশে কে ভাসালে

সাদা মেঘের ভেলা’

ভাদ্র-আশ্বিন এ দুই মাস বাংলাদেশে শরৎকাল। শরতের সৌন্দর্য বাংলার প্রকৃতিকে করে রূপময়। গাছপালার পত্রপল্লবে গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকার ফিকে হয়ে আসতেই পাখপাখালির দল মহাকলরবে ডানা মেলে উড়ে যায় নীল আকাশে।আকাশের উজ্জ্বল নীলিমার প্রান্ত ছুঁয়ে মালার মত উড়ে যায় পাখির ঝাঁক। শিমুল তুলোর মতো ভেসে চলে সাদা মেঘের খেয়া।চারদিকে সজীব গাছপালার ওপর বয়ে যায় শেফালিফুলের মদির গন্ধভরা ফূরফুরে মিষ্টি হাওয়া। শিউলি তলায় হালকা শিশিরে ভেজা দূর্বাঘাসের ওপর চাদরের মত বিছিয়ে থাকে সাদা আর জাফরন রং মেশানো রাশি রাশি শিউলিফুল। শরতের ভোরের এই সুরভিত বাতাস মনে জাগায় আনন্দের বন্যা। তাই খুব ভোরে কিশোর–কিশোরীরা ছুটে যায় শিউলি তলায়।

সূর্য ওঠে সোনার বরন রূপ নিয়ে। নির্মল আলোয় ভরে যায় চারদিক। আমন ধানের সবুজ চারার ওপর ঢেউ খেলে যায় উদাসী হাওয়া। আদিগন্ত সবুজের সমারোহ। ফসলের মাঠের একপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর রুপালি ধারায় সূর্যের আলো ঝলমল করে।নদীর তীরে কাশবনের সাদা কাশফুল কখনো হাতছানি দিয়ে ডাকে।

কাশফুলের মনোরম দৃশ্য থেকে সত্যিই চোখ ফেরানো যায় না।ভরা নদীর বুকে পাল তুলে মালবোঝাই নৌকা চলে যায়।ডিঙি নাও বইতে বইতে কোনো মাঝি হয়তো–বা গেয়ে ওঠে ভাটিয়ালি গান। পুকুরপাড়ে আমগাছের ডালে মাছরাঙা ধ্যান করে। স্বচ্ছ জলে পুঁটি,চান্দা বা খলসে মাছের রূপালি শরীর ভেসে উঠলে সে ছোঁ মেরে তুলে নেবে তার লম্বা ঠোঁটে। নদীর চরে চখাচখি, পানকৌড়ি, বালিহাঁস বা খঞ্জনা পাখির ডাক। কলসি কাঁথে মেঠো পথে হেঁটে চলে গাঁয়ের বধূ। ফসলের খেতে অমিত সম্ভাবনা কৃষকের চোখে স্বপ্নে ছাওয়া সবুজ ধানখেতটা একবার চেয়ে দেখে কৃষক।

শরতের এই স্নিগ্ধ মনোরম প্রকৃতি মানবজীবনেও এক প্রশান্তির আমেজ বুলিয়ে দেয়। কৃষকদের হাতে এ সময় তেমন কোনো কাজ থাকে না। অফুরন্ত অবসর তাদের। মাঠভরা সোনার ধান দেখে কৃষকের মনে দাদা বেঁধে ওঠে আসন্ন সুখের স্বপ্ন। শহরের মানুষ ও অবকাশ পেলে শরতের মনোরম প্রকৃতি উপভোগ করার জন্য গ্রামের বাড়িতে ছুটে যায়। নীল আকাশের সাদা মেঘের ভেলা আর নদীতীরে সাদা কাশফূল,ভোরে হালকা শিউলিভেজা শিউলিফুল সব মিলিয়ে শরৎ যেন শুভ্রতার ঋতু। শরৎকালে রাতের বেলায় জ্যোৎস্নার রূপ অপরূপ। মেঘমুক্ত আকাশ থেকে কল্প কথার পরীরা ডানা মেলে নেমে আসে পৃথিবীতে। শরতের জ্যোৎস্নার মোহিত রূপ নিজ চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। বলা যায়, শরৎ বাংলার ঋতু–পরিক্রমায় সবচেয়ে মোহনীয় ঋতু।

ফসলের হেমন্ত :

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। আমাদের এই লাল সবুজের বাংলাদেশকে ঘিরে প্রতি দু’মাস অন্তর অন্তর এক একটি ঋতু পরিবর্তন হয়! আগমন করে নিজস্ব বহুমুখী বৈচিত্র্যতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ঋতু।  আমাদের এই রূপবতী বাংলাদেশে বারো মাসে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এই ছয়টি ঋতুর পালা বদল হয় প্রতি বছর!

তাই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি কে বলা হয় ষড়ঋতুর দেশ। এই ঋতু পরিবর্তনের মধ্যে যেমন রয়েছে নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা ঠিক তেমনি রয়েছে প্রতিটি ঋতুর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বা সৌন্দর্যতা। বাংলার অপার সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ বিমোহিত হয় আমাদের প্রকৃতিপ্রেমী অন্তরদৃষ্টি ও বিদেশীয় দৃষ্টি। তাই ভালোবাসার টানে বিদেশি পর্যটকগণ ছুটে আসে পৃথিবীর মানচিত্রে ক্ষুদ্র এক লাল সবুজের প্রিয় আঙ্গিনায়। মুখে মুখে গুঞ্জরিত হয় সোনার বাংলা ধ্বনি। যার প্রতিটি ধুলিকণা যেন সোনার মতোই দামী। অথবা ফুল, ফল ও ফসলের উর্বরভূমি প্রিয় বাংলাদেশ। এ সবুজের বাংলা আমাদের তনুমন কে পুলকিত করে ষড়ঋতুর রূপের মাধুরী বা সৌন্দর্যের কমনীয়তায়। আর এ ষড়ঋতুর অনন্য ঋতু হলো রূপের রাণী সুখের বাণী পরম প্রিয় হেমন্তকাল!

স্নিগ্ধ হেমন্তকাল যেন আমাদের কে একটু বেশিই বিমুগ্ধ করে। সকালে ধানগাছের ডগায় যে শিশির জমে থাকে তা হেমন্তের মায়াবী রূপের এক ঝলক সৌন্দর্যেরই পূর্বাভাস জানান দেয়। সকালের প্রথম রোদের বর্ণচ্ছটায় গাছের পাতাগুলো যেন হেসে ওঠে। দৃষ্টিসীমা যত দূর যায়, দেখা যায়, আলোকোজ্জ্বল অপূর্ব একটি সকাল তার অভাবনীয় সৌন্দর্য নিয়ে যেন অপেক্ষমান। গাছের নরম-কচি পাতাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে মিষ্টি রোদ আর সুনীল আকাশ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। হেমন্তের রাতে মেঘমুক্ত আকাশে ফালি ফালি জোছনার আলো অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশিই ঠিকরে পড়ে। কালের চাকায় ভর করে আবারো আমাদের মাঝে সমাগত প্রিয় হেমন্তকাল। হেমন্ত মানেই শিশিরস্নাত প্রহর। শরতের কাশফুল মাটিতে নুইয়ে পড়ার পরপরই হেমন্তের আগমন ঘটে। এর পরে আসে শীত, তাই হেমন্তকে বলা হয়ে শীতের পূর্বাভাস। হেমন্তে সকালবেলা আবছা ঢাকা থাকে চারি দিকের মাঠঘাট।

বাংলার মাটি অত্যন্ত উর্বর বলে সামান্য পরিশ্রমেই ফলমূল ফলানো যায়। বছরে ছয়টি ঋতু পালাক্রমে প্রকৃতিকে আপন মনে সাজিয়ে নেয়! উপহার দেয় রূপ, রস, গন্ধেভরা সুস্বাদু বিভিন্ন ফল। এ হেমন্তকে তাই উৎসবের ঋতু বললেও ভুল হবে না। হেমন্তে বিভিন্ন ধরনের ফলের সমারোহ ঘটে। এ ঋতুর বিশেষ কিছু ফল হলো কামরাঙা, চালতা, আমলকি ও ডালিম। নারিকেল এ ঋতুর প্রধান ফল।

আগেকার দিনে বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। কারণ, ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। বর্ষার শেষের দিকে বোনা আমন ধানের গাছ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিক মাসে ধান পরিপক্ক হয়। কৃষকেরা এই সময় খুশিমনে পাকাধান কেটে ঘরে তোলে। নতুন ধানের পিঠা-পুলি আর খেজুরের রসে রসিয়ে রসিয়ে প্রয়োজন মতো আয়োজন করে নবান্ন উৎসব।

Comments

comments


Top
error: Content is protected !!