আজ || শনিবার, ১০ এপ্রিল ২০২১
শিরোনাম :
 


শিকড়ের সন্ধানে – বাপ্পু সিদ্দিকী

কালের বিবর্তনের মাধ্যমে বিচিত্র জনপদের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নানা জাতের মানুষের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এ দেশ। প্রাচীন বাংলাদেশের সীমানা নির্ণয় কঠিন। উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত সমতল ভূমি নিয়ে গঠিত ছিল প্রাচীন বাংলাদেশ। খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার বছর পূর্বে ঋজ্ঞ্বেদের ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ গ্রন্থে বঙ্গ নামে দেশের উল্লেখ আছে। তবে এই প্রবন্ধে ইতিহাসের আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে মূলত বাংলা নববর্ষে আমাদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করব।

আমরা যখন নতুন বছরকে সামনে নিয়ে আসি, তখন বিচার-বিশ্নেষণে পুরনো বছরটিও সামনে চলে আসে। কেমন কাটল গত বছরটি? দিনপঞ্জির পাতা উল্টালেই যেমন মধ্যম আয়ের দেশ, পদ্মা সেতু, মেগা বাজেট, জঙ্গি দমন, ফোর লেন সড়কের ছবি বেরিয়ে আসে, তেমনি চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রশ্নপত্র ফাঁস, এতিমের টাকা, ধর্ষণের মহামারী, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন আহাজারি, নেপালে বিমান দুর্ঘটনা। ভালো কাজের সঙ্গে কিছু মন্দ কাজ, সুজনের সঙ্গে কিছু দুর্জন, উন্নয়নের পথে কিছু অন্তরায় অতীতেও যেমন ছিল, ভবিষ্যতেও তা থাকবে। ইতিমধ্যে ‘বঙ্গবন্ধুর স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আমরা বিশ্বের ৫৭তম কৃত্রিম ভূউপগ্রহ স্থাপনাকারী দেশ হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছি। তাই ভালোমন্দ মিলিয়ে গত বছরটিকে খুব বেশি খারাপ বলা যায় না। অন্তত হরতালের মহোৎসব, চোরাগোপ্তা বোমা হামলা, বিদেশি নাগরিক হত্যা, বন্যা, মহামারী, খরা ইত্যাদি আমাদের স্বাভাবিক জীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

বাংলা নববর্ষ ১৪২৫ আমাদের জন্য সুন্দর সুবার্তা নিয়ে আসুক। সব গ্লানি মুছে, জরা ঘুচে অগ্নিস্নানে ধরা শুচি হোক- এ কামনায় আমাদের জীবন হোক কলুষমুক্ত। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে আমরা সংগ্রাম করেছি হাজার বছর ধরে। আমাদের ঐতিহ্য, স্বকীয়তা, কৃষ্টি ও মানবিক মূল্যবোধকে ধরে রাখতে সেই প্রেক্ষাপটে আমরা বাধাহীনভাবে প্রতিবছর নববর্ষকে বরণ করে নিচ্ছি আন্তরিক প্রয়াসে, গেয়ে যাচ্ছি- ‘এসো হে বৈশাখ।/ এসো, এসো,/ তাপসনিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’

আমরা উন্মুখ হয়ে আছি ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে বরণ করার জন্য। বাঙালির একমাত্র দেশ বাংলাদেশে আমরা যে রকম জাঁকালোভাবে নববর্ষকে বরণ করি, তা বোধ করি আর কোথাও এভাবে হয় না। বাংলা নববর্ষের উৎপত্তি বিকাশ অত শত না বুঝলেও নববর্ষের একটি উন্মাদনা ঠিকই আমাদের মাঝে হাজির হয়। এই দিনটি হিন্দু, মুসলিম বা বৌদ্ধদের একক কোনো উৎসবের দিন থাকে না, এটি হয়ে যায় সার্বজনীন। নতুন বছরের আগমন উপলক্ষে অনুষ্ঠিতব্য উৎসবের প্রথম দিন। এই উৎসব ধর্মভিত্তিক নয়; কিন্তু সার্বজনীন, যা পৃথিবীতে বিরল। এ দেশ দারুণভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও আমাদের নববর্ষ আশুরা থেকে নয়। সম্রাট আকবর ১০ মার্চ, ১৫৫৫ বাংলা সন প্রবর্তন করলেও তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহণের দিন ১৬ মার্চ, ১৫৫৬ সন থেকে। তিনি বঙ্গাব্দকে চান্দ্র (লুনার) সন থেকে সৌর (সোলার) সনে রূপান্তর করেন। খাজনা আদায়ের সুবিধার কথা চিন্তা করে ফসলের মৌসুমের দিকে দৃষ্টি দিয়ে হিজরি মাসের পরিবর্তে বাংলা সনকে গ্রেগারিয়ান সোলার ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি স্থাপন করেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতেহ সিরাজী এই রূপান্তরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ওই সময় অগ্রহায়ণ ছিল বাংলার প্রথম মাস। অন্যান্য মাসের নাম নক্ষত্রের নামের সঙ্গে মিল রেখে ঠিক করা হয়। দীর্ঘ সময় পরে বৈশাখ বাংলার প্রথম মাসে পরিণত হয়। ফসল ঘরে তোলার সময় নবান্নের উৎসব আজও বিদ্যমান। যেদিন বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম মাস হলো, সেদিন হতেই বৈশাখের আনন্দটি নবান্নের আনন্দের চেয়ে আরও বড় হয়ে আলাদা আঙ্গিক পেতে শুরু করল। একসময় বৈশাখ মাসের আগমনকে কেন্দ্র করে ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান শুরু হলো। বৈশাখের প্রথম দিনে পুরনো হিসাব-নিকাশ শেষ করে নতুন হিসাব শুরু করেন দোকানিরা। গ্রাহকদের দাওয়াতপত্র বিলি করেন এবং দোকানে আগতদের মিষ্টি ও নিমকি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। একটা সময় বৈশাখের আগমনে দেশের গ্রামগঞ্জে ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান উৎসবে পরিণত হয়েছিল। এখন অবশ্য হালখাতায় অতটা আগের মতো রেশ নেই। তবে বৈশাখী মেলা হয়ে আসছে বাঙালি সংস্কৃতি ও কৃষ্টির অপরিহার্যতায়। উৎসব বিনোদন, বিকিকিনি আর সামাজিক মেলামেশার উদার ক্ষেত্র মেলা। কোথাও বসে বৈশাখী মেলা আবার কোথাও চৈত্রসংক্রান্তির মেলাও বসে। অতীতে মেলা উপলক্ষে কবিগান, বাউল গান, পুতুল নাচ, যাত্রা, সার্কাসের আয়োজন হতো। বিনোদনের মাত্রা বাড়ানোর জন্য থাকত বায়োস্কোপ, নাগরদোলা, কুস্তি, ঘুড়ি উড়ানো ও ষাঁড়ের বা মুরগের লড়াই। মেলা উপলক্ষে খেলনা ও কারুপণ্য তৈরি হয় আমাদের দেশি কৃষ্টির উপাদানে। কাঠের আসবাবপত্র, মাটির তৈজসপত্র, কৃষিপণ্য ইত্যাদি পাওয়া যেত। বর্তমানে মৃৎ ও কুটির শিল্পে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এসেছে নতুনত্ব। এভাবে বৈশাখ পরিণত হলো বাঙালির প্রাণের উৎসব। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায় ও শ্রেণির মানুষ এই উৎসবে শামিল হয়। বটতলার হাটখোলায় বর্ণিল মেলা, লোকজ অনুষ্ঠান, বলীখেলা, হালখাতা সবই শুরু হয় নববর্ষকে ঘিরে। পহেলা বৈশাখে এই বিশেষ দিনে গ্রামের নদীর পাড়ে, পুরনো গাছের নিচে, খোলা জায়গাতে যেমন মেলা জমে, তেমনি শহরে লাখো মানুষের পদভারে মুখরিত হয় আনন্দ শোভাযাত্রা ও সঙ্গীতের আসর। রঙবেরঙ পোশাক পরে ঘুরে বেড়ায় লোকেরা। এই দিনের আলাদা পোশাকও এখন নির্ধারণ হয়ে গেছে। এই পোশাকের মধ্যেও আমরা খোঁজে পাই আমাদের সংস্কৃতির ছাপ। ছেলেরা কারুকাজ করা পাঞ্জাবি পরে আর মেয়েরা পরে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। খোঁপায় ফুল দেয় আবার মাথায় ফুলের মুকুটও পরে।

গ্রামে এখনও মাটির পাতিলে রান্না হয়। এতে পান্তাভাত হয় সুস্বাদু। গ্রামের লোকেরা শুকনো মরিচ ও পেঁয়াজ দিয়েই সেই ভাত খায় নববর্ষের দিনে মাটির থালাতে; যে থালাকে গ্রামের ভাষায় ‘সানকি’ বলে। সানকিতে পান্তা ইলিশ খাবারের বিষয়টি এখন চোখে পড়ার মতো। শহরের লোকেরা সিলভারের পাতিলে রান্না করে মেলামাইনের থালায় পান্তা খেয়েই অবশ্য তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। বাঙালির নববর্ষ মানেই উৎসব-উদ্দীপনা আর আনন্দের জোয়ার। শিকড়ের সন্ধানে আমরা ছুটে যাই লোকজ অনুষ্ঠানে। আবহমানকাল ধরে অনুষ্ঠানপ্রিয় জাতি প্রবর্তিত ধারায় নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে ছুটে চলেছে। গ্রাম-গ্রামান্তরে যে মেলা তাও চলছে প্রাচীন ধারায় যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এসব কিছুই আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। বাঙালি চেতনা ও সংস্কৃতির প্রবহমান ধারা হচ্ছে বাংলা নববর্ষ ও বৈশাখী মেলা। বিবর্তনের ধারায় এই অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটলেও এখনও মেলার আবেদন গ্রামীণ সমাজে জমজমাট। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে জুয়ার আসর যেন মেলার নির্মল আনন্দকে ব্যাহত না করে। মেলা অর্থ উপার্জনের না হয়ে মেলা যেন হয় বাঙালির প্রাণের মেলা। সমাজের নৈতিক অবক্ষয় যেন মেলাকে স্পর্শ করতে না পারে।

বিশ্বের সেরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিত্রকলা, নৃত্যকলা, পোশাক-পরিচ্ছেদ, কৃষ্টি-কালচারে আমরা অবশ্যই গ্রহণ করব। মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে আমরা ভুলে যেতে চাই না আমাদের মানবিক দিকগুলোর বিকাশ সাধনও প্রয়োজন। কেবল অন্ধ অনুকরণে আমরা এই ভার্চুয়াল জগতে পিছিয়ে যেতে চাই না। আমাদের মানবিক মূল্যবোধের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটিয়ে নশ্বর পৃথিবীতে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের চলার পথে নতুন বছর আসবে। দারুণ অগ্নিবাণের প্রচণ্ড তাপদাহে হৃদয়ে যতই তৃষ্ণা হানুক, আমরা বাঙালিরা নববর্ষকে সানন্দে বরণ করতে কালমাত্র বিমুখ হবো না। আমাদের অতীত ঐতিহ্য, স্বকীয়তা, কৃষ্টি, মানবিকতায় উজ্জীবিত হয়ে আমরা নিশ্চয়ই সব অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদের অবস্থান সুসংহত করার পথ দেখিয়ে যাব। বাংলা নববর্ষ ১৪২৫ আমাদের জন্য সুন্দর সুবার্তা নিয়ে আসুক। সব গ্লানি মুছে, জরা ঘুচে অগ্নিস্নানে ধরা শুচি হোক- এ কামনায় আমাদের জীবন হোক কলুষমুক্ত। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে আমরা সংগ্রাম করেছি হাজার বছর ধরে। আমাদের ঐতিহ্য, স্বকীয়তা, কৃষ্টি ও মানবিক মূল্যবোধকে ধরে রাখতে সেই প্রেক্ষাপটে আমরা বাধাহীনভাবে প্রতিবছর নববর্ষকে বরণ করে নিচ্ছি আন্তরিক প্রয়াসে, গেয়ে যাচ্ছি- ‘এসো হে বৈশাখ।/ এসো, এসো,/ তাপসনিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’

লেখক : সাবেক প্রধান শিক্ষক, মধুপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, টাঙ্গাইল।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

কমেন্ট করেছে


Top
error: Content is protected !!