গোপালপুর আজ , সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯ ইং |


বিদ্রোহের কবি কাজী নজরুল তথ্যপঞ্জি :: কে এম মিঠু

‘‘তাঁর স্মৃতি বাংলার মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত। তিনি জাগরণের কথা বলেছেন, স্বাধীনতার বাণী শুনিয়েছেন, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতির নানা মাধ্যমে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিষ্ঠিত করেন। তাঁর শেষ শয়ান বাংলাদেশের মাটিতে।’’

আবহমান বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির আকাশে নজরুল ইসলাম একটি ব্যতিক্রমী নাম। ধুমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে মাত্র ২২ বছরের সাহিত্য জীবনে সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন প্রচন্ড বিষ্ময় আর নতুন ইতিহাস। যা বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি দুমড়ে মুচড়ে নিজের মতো করে নতুনত্বে রুপ দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া তার সাহিত্য সব্যসাচিত্ব আর কোন বাঙালী লেখকের সঙ্গে তুলনার কথা ভাবা অসম্ভব।

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর স্বল্প পরিসর সাহিত্য জীবনে রচনা করেছেন ২২টি কাব্য গ্রন্থ, ৫১টিরও অধিক গল্পগ্রন্থ, উপন্যাস, প্রবন্ধগ্রন্থ, সঙ্গীতগ্রন্থ, নাটক-নাটিকা, কিশোর কাব্য, কাব্যানুবাদ, কিশোর নাটিকা- যা প্রতিটিই শিক্ষাণীয়। সবচেয়ে বিষ্ময় এই তিনি রচনা করেছেন ৫ হাজারেরও বেশী গান। যা আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোন কবি রচনা করতে সক্ষম হননি।

১১ জৈষ্ঠ ১৩০৬, ২৫ মে ১৮৯৯ বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে পিতা কাজী ফকির আহমদ, মাতা জাহেদা খাতুন এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। চার বছর বয়সে গ্রাম্য মক্তবে পাঠ শুরু করেন । ১৯০৮ সালে কবি বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়ে পরেন। ১৯১১ সালে নিম্নপ্রাথমিক পাশ করে মক্তবে শিক্ষকতা, মাজার শরীফে খাদেমগিরি, মসজিদের ইমামতি পদ গ্রহণ করেন। ঐ বছর বর্ধমানের মাথরুন গ্রামে নবীনচন্দ্র ইনষ্টিটিউটে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। লেটো দলের সাথে যুক্ত হয়ে অনেকগুলো পালা গানে অংশগ্রহণ এবং রুটির দোকানে চাকরি করেন। ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেনীতে ভর্তি হন এবং বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েই পালিয়ে গিয়ে রাণীগঞ্জে চলে যান। ১৯১৫ সালে শিয়ালসোল হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেনীতে ভর্তি এবং দশম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন পরবর্তী তার শিক্ষাজীবন শেষ হয়। তখনই কবির লেখায় হাতে খড়ি। চড়ইপাখির ছানা, করুণাগাথা, করুন বেহাগ, রাজারগড়, রাণীর গড়, ইত্যাদি কবিতা রচনা করেন।

১৯১৭ সাল থেকে পর্যায় ক্রমে শুরু হয় কবির আরেক অধ্যায়। সেনাবহিনীতে যোগদান করে করাচিতে মাস্টার হাবিলদার পদে পদোন্নতি। কুমিল্লার দৌলতপুরের আলী আকবর খানের ভাগ্নি সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস আসার বেগমের সাথে বিবাহবন্ধন। বিয়ের রাতেই দৌলতপুর ত্যাগ করেন। এ সময় আনন্দময়ীর আগমন রচনার জন্য নজরুল এর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী করা হয়। এক বছর কবি সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করেন। জেলে বসেই তিনি লিখেছেন সেই ঐতিহাসিক প্রবন্ধ ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। ১৯২৪ সালে কলকাতায় ইসলামী শরীয়ত মতে প্রমীলা সেনগুপ্তা ওরফে আশালতা সেনগুপ্তাকে বিয়ে করেন। এ সময় কবির রচনা ‘বিষের বাঁশি’ ও ‘ভাঙ্গার গান’ বাজেয়াপ্ত হয়। ১৯২৫ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্যপদ লাভ এবং ভারতীয় মজুর স্বরাজ পার্টি-তে অংশগ্রহন। এ বছরই কবির গ্রন্থ রিক্তের বেদন, চিত্তনামা, ছায়নট, সাম্যবাদী এবং কবির পত্রিকা ‘লাঙল’ প্রকাশিত হয়।

১৯২৬ সালে রচনা করেন কংগ্রেসে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের উদ্ধোধনী সঙ্গীত ‘কান্ডারী হুশিয়ার’। মুসলিম সাহিত্য সমাজের অধিবেশনে যোগদগানের জন্য প্রথম ঢাকায় আগমন। পুত্র বুলবুলের জন্ম এবং ‘পুবের হাওয়া’,’ঝিঙেফুল, দুর্দিনের যাত্রি, রুদ্রমাদল, সর্বহারা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে পুনরায় ঢাকায় আগমন করেন এবং মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ‘নতুনের গান’ -এ সুর সংযোজন ও পরিবেশনা করেন-

‘চল চল চল

উর্ধ্বে গগনে বাজে মাদল

নিম্নে উতলা ধরণীতল

অরুণ প্রাতের তরুণ দল

চল রে চল রে চল’।

ঐ বছরই তার চারটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সিন্ধু হিন্দোল, সঞ্চিতা, বুলবুল ও জিঞ্জির। পুত্র কাজী সব্যসাচী ইসলামের জন্ম ১৯২৯ সালে। ঐ বছরের ১৬ ডিসেম্বর জাতির পক্ষ থেকে কবিকে জাতীয় কবি হিসেবে বিপুল সংবর্ধণা দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত প্রচুর রচনা এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহন করে কবির দিন অতিবাহিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে সাক্ষাত, চতুর্থ পুত্র কাজী অনিরুদ্ধ ইসলামের জন্ম, নজরুল স্বরলিপি প্রকাশ, চট্টগামের রাউজানে সাহিত্য সম্মেলনে, সিরাজগঞ্জে মুসলিম তরুন সম্মেলনে, ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে যোগদান এবং ভাষন প্রদানসহ কলকাতার এলবার্ট হলে মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেন। এই সম্মেলনে সভাপতি ছিলেন কবি কায়কোবাদ। ঢাকা বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে যোগদান এবং সুর-সাকী, বনগীত, জুলফিকার, শিউলীমালা, আলেয়া, মৃতুক্ষুধা, নির্ঝর, সাপুড়ে (ছায়াচিত্র), চন্দ্রবিন্দু রচনা করেন। চন্দ্রবিন্দু, প্রলয়শিখা তৎকালীন সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়।

১৯৪২ সালে কবি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতাল ও রাচী হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু কোন পরিবর্তন হয় না। ঐ বছরের শেষের দিকে ‘নজরুল সাহায্য কমিটি’ গঠন করা হয় এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার তাকে মাসিক দেড়’শ টাকা ভাতা প্রদান করে। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘জগৎতারিনী স্বর্ণপদক’ দেয়া হয় এবং কবির কাব্যগ্রন্থ ‘নতুন চাঁদ’ প্রকাশিত হয়। ১৯৫২ সালে ‘মরু ভাস্বর’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত, ২৭ জুন কলকাতার নজরুল নিরাময় সমিতি গঠন, ২৫ জুলাই রাঁচি হাসপাতালে প্রেরণ এবং দীর্ঘ চার মাস মেজর ডেভিসের চিকিৎসাধীন থাকার পর অপরিবর্তিত অবস্থায় কলকাতায় প্রত্যাবর্তন।

১৯৫৩ সালের ১০ মে নজরুল নিরাময় সমিতির উদ্দ্যোগে কবিকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন প্রেরণ ও পরে জার্মানির ভিয়েনায় নেয়া হয়। সকল ডাক্তারের অভিমত কবি ‘পিকস ডিজিজ’ নামক মস্তিক রোগে আক্রান্ত যা চিকিৎসার অতীত। ১৪ ডিসেম্বর কবি সস্ত্রীক দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৫৯ সালের জানুয়ারীতে ‘মধুমালা’ নাটক ও কবিতা সংকলন ‘শেষ সওগাত’ প্রকাশিত হয়। ঐ বছরই প্রকাশিত হয় ‘রুবাইয়াৎ-ই ওমর খৈয়ম’ অনুবাদগ্রন্থ ও ‘ধুমকেতু’ প্রবন্ধ।

১৯৬২ সালের ৩০ জুন কবির স্ত্রী প্রমীলা নজরুল এর ইন্তেকাল হয়। ১৯৬৩-১৯৬৭ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয় কবির অমূল্য অসংখ্য রচনা শিশুতোষগ্রন্থ ‘পিলে পটকা’ ‘পুতুলের বিয়ে’ কিশোর গ্রন্থ ‘ঘুম জাগানো পাখি’,ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি’। ১৯৬৯ সালে কবিকে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি প্রদান। ১৯৭২ এর ২৪ শে মে বাংলাদেশ সরকার কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসে। ঢাকায় ২৫ মে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় কবির ৭৩তম জন্মদিবস পালিত হয়। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী মাত্র ৪৩ বছর বয়সে কবির কণিষ্ঠ পুত্র কাজী অনিরুদ্ধ ইসলামের ইন্তেকাল। ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কবিকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি প্রদান করা হয়।

১৯৭৬ সালের ২৫ জানুয়ারী কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান, ২১ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার ‘একুশে পদক’ প্রদান, ২৪ মে নজরুল জন্মোৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান কর্তৃক (হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে) সেনাবাহিনীর ‘আর্মি ক্রেস্ট’ উপহার প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগষ্ট সকাল ১০টা ১০মিনিটে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির মৃত্যুতে বাংলাদেশের সরকার রাষ্ট্রিয়ভাবে দু’দিন শোক পালন করে এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। ভারতীয় পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ এক মিনিট নীরবতা পালন করে কবির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। কবির জানাজা অনুষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশগ্রহন করেন। পরে কবির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবিকে সমাহিত করা হয়।

‘মসজিদেরই পাশে আমায়

কবর দিও ভাই

যেন/গোরে থেকেও মুয়াজ্জীনের

আজান শুনতে পাই…

কবি নজরুল ছিলেন অসাধারন প্রতিভার অধিকারী। তার জন্যই আমরা ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচারী সরকার পতন করতে বিদ্রোহী চেতনায় সাহস পেয়েছি। নজরুল আমাদের চেতনায় মিলেমিশে বাঙালীর জাতীয় জীবনের নানান সংকটে-সংগ্রামে দিয়েছেন অভূতপূর্ব প্রেরনা। যে প্রেরনায় বাঙালী বার বার জেগে উঠেছে এবং ছিনিয়ে এনেছে বিজয়। কবি যেমন তার সৃষ্ট সাহিত্যধারায় কখনো-উত্তাল সমুদ্র-তরঙ্গে তরঙ্গায়িত, কখনো অগ্নিস্রাবী বিসুবিয়ালের ধুম্রউদগীরণে প্রমত্ত, কখনো মৃদু হিন্দোলে দোলায়িত। আসুন আমরাও তাঁর সারিতে স্থান পাবার চেষ্টায় এগিয়ে চলি।

(তথ্যসূত্র: নজরুল জীবনপঞ্জি)

Comments

comments


Top