গোপালপুর আজ , শুক্রবার, জুলাই ১৯, ২০১৯ ইং |


প্রশ্ন ও প্রত্যাশা : বাংলাদেশ কি সত্যিই এখন পৃথিবীর রোল মডেল?

‘বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর রোল মডেল! কানাডা-স্পেন-থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে গেছে অামাদের বাংলাদেশ! ক’বছরের মধ্যেই দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১৯শ ডলার থেকে বেড়ে গিয়ে হবে ৪৫ হাজার ডলারে!’- এমন স্বাপ্নিক কথাবার্তা সরকারের নীতি নির্ধারকদের কাছ থেকে অামরা প্রায় প্রতিদিনই শুনে যাচ্ছি!

‘ঢাকা শহরকে বানানো হবে সিঙ্গাপুর’ কথাটি গত কয়েক বছর ধরে বারবার বলেই চলছেন আমাদের মেয়ররা। সম্প্রতি ঢাকা উত্তরের মেয়র সাহেব অামাদের জানালেন, ঢাকা শহরের পাবলিক টয়লেটগুলো এখন হয়ে গেছে ফাইভ স্টার হোটেলের মতো! অর্থমন্ত্রী বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখার সূচকে এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ কানাডা-স্পেন এবং থাইল্যান্ডের সমান হয়ে যাবে!

বিস্ময়কর, কৌতূহল এবং উদ্দীপকমাখা এমন সংবাদ শুনে, বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে অামি, উৎফুল্লচিত্তে আনন্দিত না হওয়ার কারণ দেখি না। কানাডায় যাওয়ার জন্যে বাংলাদেশের মানুষ যেখানে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা চোখবন্ধ করে খরচ করতেও রাজি থাকে। সেখানে যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা কানাডার সমান হয়ে যায়, এর চেয়ে গর্বের আর কিছু হতে পারে না। মন্ত্রীর কথামতো অামাদের শুধু একটিই কাজ, আরও কয়েকটা বছর অপেক্ষা করা।

আমরা সেই দিনের জন্যে অপেক্ষা করি আর কানাডাসহ বিশ্ব অর্থনীতির শক্তিশালী কিছু দেশের মানুষের আয়-ব্যয় তথা জীবনযাপন সম্পর্কে একটু ধারণা নেয়ার চেষ্টা করে দেখি।

কানাডাসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের নাগরিকদের নিত্যপ্রয়োজনীয় ও সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্যে অপরিহার্য উপাদানগুলোকে প্রায় মৌলিক অধিকারের সমান গুরুত্ব দিয়ে থাকে। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম যাতে সকল মানুষ নিয়মিত গ্রহণ করতে পারে, সেদিকে রাষ্টের দ্বায়িত্ব হিসেবে সুনজর রাখে।
কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো ধনী এবং পাশের দেশ ভারত এক্ষেত্রে কী করে, তা জানার চেষ্টা করলেই অামরা, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন এবং বাংলাদেশ কানাডা দেশের সমান হয়ে যাওয়ার পর কেমন হবে বা হতে পারে, তার একটা ধারণা পেয়ে যাবো!

প্রথমে বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ও মান সম্পর্কে একটু ধারণা নেই।
বাংলাদেশে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৫২৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও, প্রায় সবখানেই বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা বা তারও বেশি দামে। এক কেজি প্যাকেট দুধের দাম ৭০ টাকা। গরুর ফ্রেশ দুধ ৮০ থেকে ১০০ টাকা লিটার। এক ডজন ডিমের দাম ১০০ থেকে ১১০ টাকা। এক লিটার সয়াবিন তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা। বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি মাসে (পোশাক শ্রমিক) ৮ হাজার টাকা। বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, গড় আয় ১ হাজার ৫০০ ডলার। বর্তমানে যা বলা হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ ডলার।

বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ যে কানাডার সমান অবদান রাখার সক্ষমতা অর্জন করবে, সেই কানাডার টরেন্টো থেকে লেখক-সাংবাদিক জসিম মল্লিক সূত্রে জানা যায়, সেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৪ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা ২৫৬ টাকা এবং এক লিটার দুধের দাম ৮৫ টাকা। কানাডার সর্বনিম্ন মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ১৪ দশমিক ৮৫ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা ৯৫০ টাকা, দিনে ৭ হাজার ৬০০ টাকা, মাসে ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৪৫ হাজার ডলার।

নিউইয়র্ক থেকে সাংবাদিক নিহার সিদ্দিকী জানান, সেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৫০০ টাকা। ডিমের ডজন ১৬০ টাকা। এক লিটার সয়াবিন তেল ১০০ টাকা। এক লিটার দুধ ৬৫ টাকা। আমেরিকানদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৬০ হাজার ডলার।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে লেখক-সাংবাদিক আকিদুল ইসলাম জানান, সেখানে এক লিটার দুধের দাম বাংলাদেশি টাকায় ৬১ টাকা। এক কেজি গরুর মাংস ৪৮৮ টাকা। ডিমের ডজন ২৪৪ টাকা। সেখানে ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ২৫ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ১ হাজার ৫২৫ টাকা। দিনে ১২ হাজার টাকা, মাসে ৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি। অস্ট্রেলিয়ানদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৫৪ হাজার ডলার।

ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ সুইজারল্যান্ড থেকে সাংবাদিক বাকিউল্লাহ জানালেন, সেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৬০০ টাকা। ৫০ থেকে ৬৫ টাকা এক লিটার দুধের দাম। এক ডজন ডিমের দাম ১৮০ টাকা। সুইজারল্যান্ড সীমান্ত পার হয়ে জার্মানিতে ঢুকলে সব জিনিসের দাম অর্ধেক। সুইজারল্যান্ডের ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ৮ দশমিক ১ ফ্রাঙ্ক, যা বাংলাদেশি টাকায় ৬৬৫ টাকা। দিনে ৫ হাজার ৩২০ টাকা, মাসে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় প্রায় ৮০ হাজার ডলার।

জার্মানির অভিজাত শহর বন থেকে রূপচর্চা বিশেষজ্ঞ রোজী ভূঁইয়া জানান, সেখানে এক লিটার দুধের দাম বাংলাদেশের হিসাবে ৬০ টাকা। এক ডজন ডিম ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। রান্নার তেল লিটার প্রতি ৯০ থেকে ৯৫ টাকা। জার্মানির মাথাপিছু আয় প্রায় ৪৭ হাজার ডলার।

লন্ডন থেকে সাংবাদিক শেখ মোহিতুর রহমান বাবলু’র সূত্র বলে, লন্ডনে গরুর মাংসের কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। এক ডজন ডিম ৯০ টাকা। রান্নার তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা লিটার। দুধের লিটার ৯০ টাকা। ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ৯০০ টাকা। দিনে ৭ হাজার ২০০ টাকা। মাসে ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় প্রায় ৪০ হাজার ডলার।

ইতালির ভেনিস থেকে সাংবাদিক পলাশ রহমান জানান, গরুর মাংসের কেজি ৫৫০ টাকা। এক লিটার দুধ ৫০ টাকা। ডিমের ডজন ১২০ টাকা। তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা লিটার। ইতালিয়ানদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৩২ হাজার ডলার।

পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল ও এশিয়ার উন্নত দেশ জাপানের টোকিও। সেখান থেকে সাংবাদিক রাহমান মনি জানালেন, জাপানে গরুর মাংসের কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা। ডিমের ডজন ২০০ টাকা, দুধের লিটার ২০০ টাকা। জাপানে ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার ২০০ টাকা। দিনে ৯ হাজার ৬০০ টাকা, মাসে ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। জাপানিজদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৪০ হাজার ডলার।

এশিয়ার আরেকটি উন্নত দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির সিউল শহর থেকে আইটি ব্যবসায়ী এমএন ইসলাম জানালেন, সেখানে ডিমের ডজন ৯৫ টাকা, গরুর মাংস ৭৫০ টাকা কেজি, খাসির মাংস ৭১৫ টাকা কেজি, দুধের লিটার ১১৫ টাকা। মাসে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম আয় ২ লাখ টাকার উপরে।

এশিয়ার ধনী দেশ সিঙ্গাপুর থেকে ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান জানালেন, সিঙ্গাপুরে প্রায় সব জিনিসই আমদানি করা। এখানে ফ্রোজেন গরুর মাংসের কেজি ৫৫৮ টাকা। এক ডজন ডিম ১০৮ টাকা। ন্যূনতম মজুরি দিনে ৪ হাজার এবং মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় প্রায় ৫৮ হাজার ডলার।

এবার অামাদের পাশের দেশ ভারতের চিত্রটা দেখে নেই। কলকাতা থেকে সাংবাদিক প্রতীম রঞ্জন বোস জানান, বাংলাদেশি টাকায় এক ডজন ডিমের দাম ৬০ টাকা। দুধের লিটার ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। গরুর মাংসের কেজি ২১০ থেকে ২৪০ টাকা। খাসির মাংস ৭০০ থেকে ৭২০ টাকা কেজি। চাল ৪২ থেকে ৫০ টাকা কেজি। ভারতের ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। তাদের মাথাপিছু আয় প্রায় ২ হাজার ডলার।

কানাডার একজন শ্রমিক ঘণ্টায় আয় করেন ৭ হাজার ৬০০ টাকা, বাংলাদেশি শ্রমিকের ঘণ্টায় আয় ৩৩ টাকা, দিনে ২৬৭ টাকা। কানাডার শ্রমিক দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করে মাসে আয় করেন ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা। বাংলাদেশের শ্রমিকের মাসে আয় ৮ হাজার টাকা।
একজন বাংলাদেশি শ্রমিক তার দুই দিনের আয় দিয়ে এবং একজন পরিশ্রমী কৃষক এক মন ধান বিক্রির টাকা দিয়েও এক কেজি গরুর মাংস কিনতে পারেন না। অার কানাডার একজন শ্রমিক তার এক মাসের আয় দিয়ে, অনায়াসে একটি গাড়ি কিনতে পারেন।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ খেতে না পারায় বাংলাদেশে অপরিণত শিশু জন্মহার সবচেয়ে বেশি। আয় এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সামঞ্জস্য না থাকায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক মেধা বিকশিত হচ্ছে না।

ভারত সরকার মাছ, মাংস, ডিম ও দুধের দাম তাদের ক্রয়সীমার মধ্যে রেখেছে। ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে চালের দামও কেজিতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি।
উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং ভারতে পণ্যের মান নিয়ে তাদের তেমন প্রশ্ন নেই। কিন্তু অামাদের বাংলাদেশে মানসম্মত পণ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখার সূচকে বাংলাদেশ যদি কানাডা দেশের সমান হয়, সেদিন কি একজন বাংলাদেশী শ্রমিকের বেতন ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা হবে? হবে কি গরুর মাংস কেজি প্রতি ২৫৬ টাকা? পারবে কি দেশের সব মানুষ সাধ্যমতো মাছ, ডিম, দুধ, সবজি ও চাল কিনে ভাত খেতে? বন্ধ হবে কি টাকা অার উন্নত জীবনযাপনের জন্য, ভূমধ্যসাগরে দেশের তরুণ প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া? ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায়, হবে কি বন্ধ দেশের পরিশ্রমী কৃষকদের আহাজারি অার চিন্তাগ্রস্ত মুখ দেখা?

সম্পাদনা : কে এম মিঠু
মূললেখা : [email protected]

Comments

comments


Top