গোপালপুর আজ , শুক্রবার, অক্টোবর ১৮, ২০১৯ ইং |


’’দুর্গতিনাশিনী দেবী’’ – সন্তোষ কুমার দত্ত

শারদীয় দুর্গোৎসব ১৪২৬ সমাগত, আগামী ০৩ অক্টোবর সায়নকালে দেবীর বোধনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এ উৎসব ০৮ অক্টোবর বিজয়ী দশমীতে শেষ হবে। আত্মার শুদ্ধ নিবেদনই শ্রেষ্ঠ উপাচার, শান্তি সংহতি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক দেবী দুর্গা। ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’ বিশ্বব্যাপী আবারিত মঙ্গল ধ্বনি বয়ে যাক, মহাশক্তি ত্রিনয়নি এমন প্রত্যয় বার্তা নিয়ে আসছেন লোকালয়ে। দুর্গাকে দুর্গতিনাশিনী দেবী হিসেবে আরাধনা করা হয়। আরাধনার মূল বিষয়টিই দুর্গতিনাশ। দেবতা বা দেবী-যাঁকেই ভক্তি, আরাধনা করুন না কেন, তাঁর একটি প্রার্থনা থাকে। সে প্রার্থনা হচ্ছে, যেন তাঁর দুর্গতি দূর হয়। এ দুর্গতি দূর হওয়ার ব্যাপারটি জগতের হতে পারে, জগতোত্তরও হতে পারে। জগতের হতে পারে এ অর্থে যে, ভক্ত চাইছেন, তিনি জীবনযাপন করতে গিয়ে যেসব দুর্গতির মধ্যে পড়েছেন, সেগুলো যেন দূর হয় বা চাইছেন মৃত্যুর পর তিনি যেন কোনো দুর্গতির মধ্যে গিয়ে না পড়েন। ফলে প্রার্থনা জগতের জন্যেও, জগতোত্তরের জন্যও। কিন্তু অন্য কোনো দেবী বা দেবতা বিশেষভাবে দুর্গতিনাশের জন্য অভিহিত হচ্ছেন না। শুধু দুর্গাকেই দুর্গতিনাশিনী বলা হচ্ছে। এর সঠিক কারণ কী, সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা মেলে না। তবে পন্ডিতরা ভেবে থাকেন, দুর্গাকে দুর্গতিনাশিনী বলা হয় বিশেষভাবে এ জন্য যে তিনি দুর্গতি মোচনের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণটি রচনা করেন এবং যে দুর্গতিটি তিনি মোচন করেন, সেটিও সব দুর্গতির সেরা।

পৌরাণিক সাহিত্য একটি বিশাল বিষয়। ভারতবর্ষে প্রাচীনকালে যে বিস্ময়করভাবে বিশাল পৌরাণিক সাহিত্য রচিত হয়েছে, এর কোনো তুলনা পৃথিবীতে নেই। গ্রিক পুরাণ আছে, ভারতবর্ষের পৌরাণিক সাহিত্যের পরই এর স্থান। তবে গ্রিক পুরাণ এখন শুধুই অতীতের বিষয়, সাহিত্যে কখনো কখনো এর কোনো না কোনো বিষয় বা চরিত্রের উল্লখ করা হয়। কোনো প্রকার পুজা বা আচারের সঙ্গে এর কোনো সজীব সম্পর্ক এখন আর নেই। তবে ভারতবর্ষের পৌরাণিক সাহিত্য এখনো সমাজের সজীব আচরণের মধ্যে প্রচ- স্থান করে আছে। শুধু অষ্টাদশ পুরাণ বলে কথা নয়, মূল পুরান নিয়ে কত যে উপপুরাণ রচিত হয়েছে, এর কোনো কূল করে ওঠা প্রায় অসম্ভব। কেননা এ উপপুরাণগুলো ক্লাসিক্যাল স্তরে যেমন রয়েছে স্বল্পসংখ্যায়, লৌকিক স্তরে এসে এর সংখ্যা প্রায় অগণিত হয়ে উঠেছে। ক্লাসিক্যাল পুরাণে যেমন ক্লাসিক্যাল দেব-দেবী নিয়ে কথা হয়েছে, লৌকিক পুরাণে লৌকিক দেব-দেবী নিয়ে কথা হয়েছে। পুরাণের এ উভয় সংস্করণে, কাহিনী যে সব সময় এক রকম রয়েছে, তা নয়, পার্থক্য হয়েছে, হওয়াই স্বাভাবিক। যেহেতু সাহিত্যের বুদ্ধি ধর্মবুদ্ধির সঙ্গে এসে মিলিত হয়েছে। দুর্গা সম্পর্কে আমরা ক্লাসিক্যাল পৌরাণিক সাহিত্যেও জানতে পারি, লৌকিক-পৌরাণিক সাহিত্যেও তাঁর গুণব্যাখ্যানের শেষ নেই। তবে শারদীয় দুর্গোৎসব যেভাবে বাঙালি হিন্দুসমাজ পালন করে থাকে, তার ভিত্তি হচ্ছে ক্লাসিক্যাল পুরাণ। তিনি ক্লাসিক্যাল ধর্মসাহিত্যে বর্ণিত অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী এক দেবী, যিনি মহিষাসুরকে হত্যা করে স্বর্গরাজ্যকে দেবতাদের জন্য মুক্ত করে দেন। এখানেই আসে তাঁর দুর্গতিনাশিনী রূপের প্রশ্নটি। যে কথা আমি এর আগে উল্লেখ করেছিলাম, দুর্গতিনাশ করে সব দেব-দেবীই, শুধু শ্রীদুর্গাকেই দুর্গতিনাশিনী বলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে পন্ডিতদের মতটি উপস্থাপন করাই আমার বর্তমান উদ্দেশ্য। অসুর একসময় স্বর্গ দখল করে নিল। দেবতারা প্রাণভয়ে স্বর্গ ত্যাগ করে যে যেভাবে পারলেন পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করলেন। দুর্গা সেই স্বর্ণজয়ী অসুরকে সংহার করে দেবতাদের জন্য স্বর্গভূতিকে নিরাপদ করে দিলেন। স্বর্গ বলতে বোঝাচ্ছে- আদর্শলোক, সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান, দেবতার বাসভূমি। অসুর বলতে বোঝায়-ভয়ংকর, জ্ঞানদ্বেষী পেশিশক্তি। সে কারো পরোয়া করছে না, সে এতটাই উদ্ভটভাবে অহংকারী ও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে যে দেবতাদের স্বর্গ থেকে উচ্ছেদ করতেও সে পিছপা হচ্ছে না। অর্থাৎ সে যা কিছু মঙ্গলকর, যা কিছু জ্ঞানকর, যা কিছু কল্যাণময়, যা কিছু স্বপ্নের, যা কিছু সাধনার, যা কিছু শ্রেয়- সব কিছুকেই সে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অসুর যা করছে, তা কোনো নির্দিষ্ট একটি বিষয় নয়, সে সামগ্রিকভাবে মঙ্গলকে বিনাশ করতে উদ্যত হয়েছে এবং তাতে সে সাফল্য অর্জন করতে দেওয়া যায় না। যেভাবেই হোক, তাকে তো পরাস্ত করতেই হবে। মঙ্গলকে তো নিরাপদ করতেই হবে। মঙ্গলের বা শুভের নিরাপত্তা বিধান করলেন দেবী দুর্গা। তিনি অজ্ঞান, অহমিকায় অন্ধ পেশিশক্তিকে নাশ করলেন। তাঁর এ অসুরনাশন কোনো নির্দিষ্ট একটি ঘটনার সীমায় আবদ্ধ নয়। অসীম এর ব্যঞ্জনা, কালজয়ী এর অনুষঙ্গ, পৌরাণিক হয়েও রূপক আকারে এ ঘটনা অতি আধুনিক। দুর্গার সঙ্গে রইলেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। লক্ষ্মী ধনশক্তি, সরস্বতী জ্ঞানশক্তি, কার্তিক শারীরিক শক্তি ও গণেশ সিদ্ধির প্রতীক দেবতা। দুর্গার সঙ্গে এরাও পূজিত হয়ে আসছেন। এ থেকে আমরা বুঝতে পারছি, পন্ডিতরা যেমন জানাচ্ছেন, অশুভের বিরুদ্ধে যদি সংগ্রামে জয়লাভ করতে হয়, তাহলে আমাদের ধনশক্তি দরকার, জ্ঞানশক্তি দরকার, শারীরিক শক্তি দরকার এবং সর্বোপরি দরকার সিদ্ধি, যে সিদ্ধির দেবতা গণেশ। গণেশ কথাটির অর্থ হচ্ছে, সর্বসাধারণের হিতকারী। তিনি মুষ্টিমেয়ের হিত করেন না, সবার হিত করেন। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, দুর্গা যে বিপদনাশের জন্য যুদ্ধ করলেন, জয়লাভ করলেন, তার ফল দিয়ে তিনি সর্বসাধারণের মঙ্গলের বিষয়টি নিশ্চিত করলেন। সেই জয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ জয়, যার দ্বারা সর্ব সাধারণ জয়ী হয়। পৌরাণিক সাহিত্যে বহু প্রশংসিত, বহুভাবে বন্দিত মহাদেবী এ মহাবিজয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দুর্গতিনাশিনীর মহাবিশেষণে বিভূষিত হলেন। তিনি শুধু পুরাণে রইলেন না, আমাদের জীবনে চলে এলেন। আমাদের সমকালীন পৃথিবীর বহু ঘটনাকে এ মহারূপকের ব্যঞ্জনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। শ্রীদুর্গা এ অর্থে চিরপ্রবীণ ও চিরনবীন। তিনি ছিলেন, তিনি আছেন, তিনি থাকবেন, চিরকাল তিনি আমাদের দ্বারা পূজিত হবেন।

এখানে উল্লেখ্য, এ বছর দেবী দুর্গার আগমন ও গমন ঘোটকে। ফলম্- ছত্রভঙ্গস্তরঙ্গমে। এমতাবস্থায় দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা থাকবে দেশ থেকে জঙ্গিবাদ, ডেঙ্গু প্রবণতা, মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতিসহ সকল অনাচার বিনাশ হয়ে ফুলে ফলে শোভিত হয়ে একটি সুখী সৃমদ্ধশালী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ে উঠুক।

দুর্গার পরিবার পরিচিতি :

বাংলার দেবী দুর্গার যে মূর্তিটি সচরাচর দেখা যায় সেটি সপরিবারে দুর্গার মূর্তি। এই মূর্তির মধ্যে দেবী দুর্গা সিংহবাহকী ও মহিষাসুরমর্দিনী। তার ডানপাশে উপরে দেবী লক্ষী ও নিচে গণেশ, বামপাশে উপরে দেবী সরস্বতী ও নিচে কার্তিক। কলকাতায় সাবর্ন রায় চৌধুরী পরিবার ১৯১০ সালে এই সপরিবারে দুর্গা পূজা চালু করেন। তারা কার্তিকের রূপ দেন জমিদার পুত্রের, যা তৎপর্বে ছিল সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের আদলে যুদ্ধের দেবতা রূপে। এ ছাড়াও বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর সংলগ্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার এক বিশেষ মূর্তি দেখা যায়। সেখানে দেবীর ডানপাশে উপরে গণেশ ও নিচে লক্ষী, বামে উপরে কার্তিকের ও নিচে সরস্বতী ও কাঠামোর উপরে নন্দী ভূঙ্গীসহ বৃষবাহন শিব ও দুইপাশে দেবীর দুই সখী জয়া ও বিজয়াকে দেখা যায়। কোলকাতায় কোন কোন বাড়িতে দুর্গোৎসব লক্ষী ও গণেশকে সরস্বতী ও কার্তিকের সঙ্গে স্থান বিনিময় করতে দেখা যায়। আবার কোথাও কোথাও দুর্গাকে শিবের কোলে বসে থাকতেও দেখা যায়। এগুলো ছাড়াও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার বিভিন্ন রকমের স্বতন্ত্র মূর্তিও চোখে পড়ে। তবে দুর্গার রূপকল্পনা বা কাঠামোর যতই বৈচিত্র থাকুক বাংলার দুর্গোৎসব প্রায় সব জায়গায়ই দেবী দুর্গাকে সপরিবারে পূজা করা হয়।

দুর্গা- দুর্গ নামক একজন যিনি অসুরকে বধ করেন তিনিই দুর্গা নামে পরিচিত। আবার শ্রী শ্রী চৈতন্য অনুসারে এই দেবীই সব দেবতার একত্রে শক্তির প্রতিমূর্তি।

সিংহ- দেবী দুর্গার বাহন সিংহ। দুর্গা পূজার সময় সিংহেরও পূজা করতে হয়। সিংহ মূলত রজোগুণের এক প্রচন্ড শক্তির উচ্ছাসের প্রতীক। এছাড়াও সিংহ মানুষের পশুত্ব বিজয়েরও প্রতীক।

মহিষাসুর- মহিষাসুর অসুর অর্থাৎ দেবদ্রোহী। তাই দেবী প্রতিমায় দেবীর পায়ের নিচে এই অসুর ‘সু’ এবং ‘কু’ এর মধ্যকার চিরকালীন দ্বন্ধে অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। সাধারণ মানুষের জীবনে দুঃখ-কষ্ট, ভয়-ভীতি, আপদ-বিপদ এ সবই আসুরিক শক্তির কাজ। যা দুর্গা এই অসুরকে বিনাশ করে।

তবে অসুর হলেও দুর্গোৎসবে মহিষাসুরেরও পূজা চলে আসছে। কালিকা পূরাণ অনুসারে মৃত্যুর কিছু সময় আগে নিজের মৃত্যুর অবস্থা স্বপ্নে দেখে ভয় পেয়ে মহিষাসুর ভদ্রকালীকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। ভদ্রকালী তাকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি না দিলেও তার ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে আর্শীবাদ করতে চান। মহিষাসুর দেবতাদের যজ্ঞভাগ বর চাইলে দেবী সেই বর দিতে রাজি হননি। কিন্তু মহিষাসুরকে এই আর্শীবাদ দেন যে যেখানেই দেবীর পূজা হবে সেখানেই তার পায়ের নিচে মহিষাসুরের জায়গা হবে।

গণেশ- গণেশ সিদ্ধির দেবতা। পূরাণ অনুসারে তিনি সর্বাওপূজ্য। গণেশের পূজা না করে অপর কোন দেবতার পূজা করা বিধান নাই। গণশক্তি যেখানে ঐক্যবদ্ধ সেখানে সব প্রকার বাধা বিঘœ দূর হয়। দেবাসুর যুদ্ধে দেবতারা যতবারই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অসুরদের সঙ্গে লড়াই করেছেন ততবারই তারা জয়ী হয়েছেন। গণেশের আর এক নাম বিঘœনাশ। অর্থাৎ বিশ্ননাশকারী। বিঘেœ সন্তুষ্ট থাকলে মুক্তি নিশ্চিত বলে ধরা যায়। গণেশের বাহন মুষিক বা ইঁদুর।

লক্ষী- লক্ষী শ্রী, সমৃদ্ধি, বিকাশ ও অভ্যুদয়ের প্রতীক। শুধু ধনৈশ্বর্যই নয়, লক্ষী চরিত্র ধনেরও প্রতীক। লক্ষীর বাহক পেঁচক বা পেঁচা। রূপে ও গুণে অতুলনীয় এই দেবীর এমন বিসৃত বাহন কেন, সে নিয়ে বেশ কয়েকটি মত প্রচলিত। তবে হিন্দু শাস্ত্রে কোথাও পেঁচাকে লক্ষীর বাহন হিসেবে দেখানো হয়নি। এটি একান্তই বাঙালি লোকবিশ্বাস। পেঁচা দিনে চোখে দেখে না তাই মনে করা হয় যারা দিনে চোখে দেখে না অর্থাৎ তত্ত্ব বিষয়ে অজ্ঞ- তারাই পেচকধর্মী। অনেকের ধারনা মানুষ যতকাল পেঁচকধর্মী থাকে ততদিনই সে ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষীর আরাধনা করে। তারা পেঁচাকে মুক্তিাকামী সাধক বলে।

সরস্বতী- সরস্বতী জ্ঞানশক্তির প্রতীক। সরস্বতীর হাতে থাকে পুস্তক ও বীণা। সরস্বতীকে ধরা হয় বিদ্যা ও সুরের দেবী। সরস্বতীর বাহন হংস। হংস হিন্দুদের নিকট একটি পবিত্র প্রতীক।

কার্তিকেয়- দেবতাদের সেনাপতি কার্তিকেয় বা কার্তিক সৌন্দর্য ও শৌর্যবীর্যের প্রতীক। যুদ্ধে শৌর্য-বীর্য প্রদিক্ষণ একান্ত প্রয়োজন। তাই সাধক জীবনে এবং সাধারণ জীবনে কার্তিকেয়কে সন্তুষ্ট করতে পারলে শৌর্য-বীর্য লাভ করা যায় বলে সবার ধারনা।

কার্তিকেয়ের বাহন ময়ূর। সৌন্দর্য ও শৌর্য কার্তিকেয়র এই দুই বৈশিষ্ট্যই তার বাহন ময়ূরের মধ্যে দেখা যায়।

বিজয়া দশমী সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন ও অন্যায়কে প্রতিহত করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিন :

শারদীয় দুর্গোৎসব-১৪২৬ সমাগত। আগামী ০৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সায়নকালে দেবীর বোধনের শুরু হবে এ উৎসব চলবে ০৮ অক্টোবর মঙ্গলবার পর্যন্ত। ০৪ অক্টোবর শুক্রবার ষষ্ঠী, ০৫ অক্টোবর শনিবার সপ্তমী, ০৬ অক্টোবর রবিবার মহাঅষ্টমী, ০৭ অক্টোবর সোমবার মহানবমী ও ০৮ অক্টোবর মঙ্গলবার দশমী বিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হবে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নানা আনুষ্ঠানিকতা ও আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুভ বিজয়া দশমী পালন করে থাকে। বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয় বিজয়া শোভাযাত্রা, ঢাক, কাঁসর, সানাই ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সাধারণত রেওয়াজ অনুযায়ী প্রতিমা বিসর্জন হয়ে থাকে। বিভিন্ন স্থানে বসে মেলা, মন্দির অঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, কীর্তন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি। দেবীকে সিঁদুর পরানো, মিষ্টিমুখ করানোও হয়ে থাকে এ পর্বে। সধবা নারীরা একে অন্যের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দীর্ঘায়ু কামনা করেন। প্রতিবেশিদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়, ধান দূর্বা ছিটিয়ে আশীর্বাদ করার প্রথা আজও বিদ্যমান। আত্মীয় স্বজন ও দরিদ্রদের মধ্যে বস্ত্রদানসহ বিভিন্ন আয়োজন সংক্ষিপ্ত পরিসরে হলেও আজো চোখে পড়ে।

হিন্দু ধর্মীয় বিশুদ্ধ পঞ্জিকা অনুসারে বিজয়া দশমীর তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু মহিষাসুরকে বধ করার পর আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে এই দশমীর দিন দেবী দুর্গা বিজয়োৎসব করেন, সেহেতু দশমী বিজয়ের দিন, অন্যায়কে প্রতিহত করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিন। দুর্গাপূজা তথা বিজয়া দশমী ঐক্যের প্রতীক, কারণ দেবী দুর্গা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির প্রকাশ। বিজয়া দশমী সকল ক্ষেত্রে অশুভ শক্তিকে দূর করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় প্রেরণা দান করে।

বিজয়া দশমীর শিক্ষায় মায়ের ঐশ্বরিক শক্তির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। এদিনে নিজেদের মধ্যে সকল সুখ, দুঃখ ও কষ্ট ভুলে গিয়ে নতুন উদ্যমে নিজেদের মধ্যে সংহতি, একাত্মতা বৃদ্ধি পায়। পারস্পরিক হিংসা ও বিদ্বেষ ভুলে সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য সৃষ্টির দিন বিজয়া দশমী। অন্যায়, অবিচার ও সমাজের জন্য অকল্যাণকর কাজসমূহ ভুলে গিয়ে মায়ের সকল স্নেহ, মায়া-মমতা ও ভালবাসায় আবদ্ধ হওয়ার দিন শুভ বিজয়া। এদিনে সামাজিক সংহতি ও সৌহার্দ্য বোধেরও জন্ম নেয়। দুর্গা পূজা আমাদের আর্থ সামাজিক, পরিবার ও নৈতিক জীবন উন্নয়নে অপরিসীম ভূমিকা পালন করে থাকে।

দেবী দুর্গা জগতে সত্য, শান্তি, কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করেন। দেবী দুর্গার কাছ থেকে ভক্তরা শান্তি, সত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রেরণা পায়। এ থেকে ভক্তরা অন্যায়, অবিচারের পথ পরিহারের শিক্ষা গ্রহণ করে থাকেন।

দুর্গাপূজায় সকল সম্প্রদায়ের স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণ আজও লক্ষণীয়। এখানে সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় হয় যা সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐক্যের প্রতীক। এজন্য বিজয়ার মধ্যে দিয়ে ঘটে সাম্প্রদায়িক সম্প্র্রীতির মেলবন্ধন। প্রমাণিত হয় ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।

পরিশেষে সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা, যুগে যুগে বিজয়া দশমী হোক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন, বিজয়া দশমী হোক অন্যায়কে প্রতিহত করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিন। শুভ বিজয়া।

প্রবন্ধকার পরিচিতি : শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী।

Comments

comments


Top