গোপালপুর আজ , শুক্রবার, জুলাই ১৯, ২০১৯ ইং |


গোপালপুরে ২০১ গম্বুজ মসজিদ পরিদর্শন ও হেলিপ্যাড উদ্বোধন করলেন ধর্মমন্ত্রী

কে এম মিঠু, গোপালপুর :
টাঙ্গাইলের গোপালপুরের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে নির্মাণাধীন ঐতিহাসিক স্থাপনা ২০১ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ পরিদর্শন ও মসজিদ সংলগ্ন হেলিপ্যাডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় ধর্মমন্ত্রী আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমান।
রবিবার বিকেলে হেলিকপ্টার যোগে নির্মাণাধীন শৈল্পিক স্থাপনা এ ঐতিহাসিক ২০১ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ পরিদর্শন ও মসজিদ সংলগ্ন বাদল হেলিপ্যাড এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে মসজিদ কমিটি কর্তৃক আয়োজিত বীরমুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা বীরমুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে ধর্মমন্ত্রী আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে আলোচনা সভায় অংশ গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ’নির্মাণাধীন এ ঐতিহাসিক ২০১ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ দেশের অন্যতম ধর্মীয় স্থাপনা। এ ধরনের উদ্যোগ সমাজের জন্য কল্যাণকর।’
এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ, এ্যাননটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট শিল্পপতি ইউনূছ বাদল, গোপালপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসূমুর রহমান, পৌর মেয়র রকিবুল হক ছানা, ওসি মুহাম্মদ আব্দুল জলিল, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুস সোবহান তুলা, জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, উপজেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
উল্লেখ্য, টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে তৈরি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ২০১ গম্বুজ এবং ৪৫১ ফুট উচ্চতায় বিশ্বের দ্বিতীয় উঁচু মিনার বিশিষ্ট মসজিদ। মিনারের উচ্চতা হবে ৫৭ তলা ভবনের উচ্চতার সমান। মসজিদটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। বিশ^ মসজিদের ইতিহাসে জায়গা নিয়ে বিশ^ রেকর্ড সৃষ্টি করে গিনেজ রেকর্ডবুকে নাম লেখাবে নির্মাণাধীন ঐতিহাসিক এ মসজিদটি। আল্লাহর ঘর এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি বাংলাদেশকে বিশ্বে নতুন করে পরিচিত করে তুলতে সহায়ক হবে এবং প্রচুর দেশি-বিদেশি পর্যটক, ওলি আউলিয়ার আগমন ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে মসজিদটি নির্মিত হচ্ছে। ২০১ গম্বুজ মসজিদের পাশেই ইটের তৈরি ৪৫১ ফুট উচ্চতার (১৩৮ মিটার, ৫৭ তলা উচ্চতা সমান) বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম মিনারটি হবে বিশ্বের সবচাইতে উঁচু মিনার।
জানা যায়, বর্তমানে ইটের তৈরি বিশ্বের সবচাইতে উঁচু মিনারটি ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত কুতুব মিনার। যার উচ্চতা ৭৩ মিটার বা ২৪০ফুট এবং এর সিঁড়ি রয়েছে ৩৭৯টি। সুলতান মোহাম্মদ ঘুড়ির সেনাপতি ও প্রতিনিধি কুতুবউদ্দিন আইবেক ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে চৌহান রাজা পৃথিরাজকে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং বিজয়টি স্মরণীয় করে রাখতে এ মিনার তৈরি করেছিলেন। এটি তাজমহলের চেয়েও বেশি পর্যটক পরিদর্শন করেন। আর বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনারটি মরক্কোর কাসাব্লাংকায় দ্বিতীয় হাসান মসজিদে অবস্থিত। এর উচ্চতা ২১০ মিটার (৬৮৯ ফুট) ৬০ তলা ভবনের সমান। তবে এটি ইটের তৈরি নয়।
সার্বক্ষণিক নির্মাণাধীন এ মসজিদের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের ভাই মো. হুমায়ুন কবির জানান, নিজেদের তত্বাবধানে নির্মাণাধীন অবস্থায়ই ২০১ গম্বুজ মসজিদে ইতিমধ্যে ঈদের নামাজ আদায় শুরু হয়েছে। প্রায় ১৫ বিঘা জমির ওপর এ মসজিদ কমপ্লেক্সে থাকবে অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। মিহরাবের দুই পাশে লাশ রাখার জন্য হিমাগার তৈরি করা হবে। পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলেও মসজিদে ফ্যান লাগানো হবে শতাধিক। মোট গম্বুজের সংখ্যা হবে ২০১টি। মসজিদের ছাদের মাঝখানে থাকবে ৮১ ফুট উচ্চতার একটি বড় গম্বুজ এবং চারদিকে থাকবে ১৭ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ২০০টি গম্বুজ। মূল মসজিদের চার কোনায় ১০১ ফুট উচ্চতার চারটি মিনার থাকবে। পাশাপাশি ৮১ ফুট উচ্চতার আরও চারটি মিনার থাকবে। ১৪৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪৪ ফুট প্রস্থের দ্বিতল বিশিষ্ট মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। দেয়ালের টাইলসে অংকিত থাকবে ৩০ পারা পবিত্র কোরআন শরীফ। যে কেউ বসে বা দাঁড়িয়ে মসজিদের দেয়ালের কোরআন শরীফ পড়তে পারবেন। আর মসজিদের প্রধান দরজা তৈরিতে ব্যবহার করা হবে ৫০ মন পিতল। আজান প্রচারের জন্য মসজিদের দক্ষিণ পাশে নির্মাণ করা হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে উচুঁ মিনারটি। উচ্চতার হিসেবে মিনারটি হবে প্রায় ৫৭ তলার সমপরিমাণ অর্থাৎ ৪৫১ ফুট। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে নির্মাণ করা হচ্ছে পৃথক দুটি পাঁচতলা বিশিষ্ট ভবন। সেখানে থাকবে দুঃস্থ মহিলাদের জন্য বিনামূল্যের হাসপাতাল, এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, দুঃস্থ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের জন্য পূণর্বাসনের ব্যবস্থা। মসজিদের উত্তর-পশ্চিম পাশে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে দেশি-বিদেশি মেহমানদের থাকা-খাওয়ার সু-ব্যবস্থার জন্য। পশ্চিমে ঝিনাই নদী থেকে মসজিদ পর্যন্ত সিঁড়ি করা হবে এবং নদীর ওপরে একটি সেতু নির্মাণ করা হবে। চারপাশে করা হবে দেশি-বিদেশি ফুলের বাগান।
হুমায়ুন কবীর আরো জানান, টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে ঝিনাই নদীর তীরে অবস্থিত সুদৃশ্য এ মসজিদটির নির্মাণ নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়েছে ২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি। কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের মা রিজিয়া খাতুন। আশা করা হচ্ছে, ২০১৭ সালের মধ্যে মসজিদের বাকী কাজ শেষ হবে এবং ২০১৮ সালের প্রথম দিকে পবিত্র কাবা শরিফের ইমামের ইমামতির মাধ্যমে মসজিদের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। ইতোমধ্যেই নির্মাণ করা হয়েছে দুইটি হ্যালিপ্যাড। আমাদের প্রত্যাশা, শৈল্পিক স্থাপনা হিসেবে এ মসজিদটি অনন্য বৈশিষ্ট্যের এক প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে। মসজিদের দেশ বাংলাদেশকে বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দেবে নতুন করে। ইতোমধ্যেই নির্মাণাধীন অবস্থায় মসজিদটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য পর্যটক নির্মাণকাজ দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন।
মসজিদটির নির্মাতা বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যামপ্লয়িজ ফেডারেশনের সভাপতি (সিবিএ) বীরমুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বলেন, ’আমি দেশের প্রয়োজনে ১৯৭১ সালে হানাদার মুক্ত করতে যুদ্ধ করেছি, পরাধীনতা থেকে মুক্ত করেছি আমার প্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশকে। দেশের ও মানবতার কল্যাণে সাধ্যমত সেই তরুণ বয়স থেকেই কাজ করে এসেছি। দীর্ঘ ৪৪ বছর যাবৎ সততার সঙ্গে জনতা ব্যাংক লিমিটেডের নির্বাচিত সিবিএ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। এই বয়সে এসে আমার নতুন করে চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই, বাকী জীবনটুকু মহান আল্লাহতায়ালা ও মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই। আমি চাই না আমার মৃত্যুর সময় আমার ব্যাংক একাউন্টে এক হাজার টাকাও জমা থাকুক, এ লক্ষ্যে মহান আল্লাহপাকের নামে দুঃসাহসী এ উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বীরমুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের নিবন্ধন দেয়ার জন্য।
প্রকল্পের পুরো নির্মাণকাজ শেষ করতে এবং সঠিকভাবে পরিচালনা করতে প্রায় ১০০ কোটি বাংলাদেশী টাকার দরকার হবে। ৪৫০ শতাংশ জায়গায় আমার সাধ্য অনুযায়ী কল্যাণ ট্রাষ্টের মাধ্যমে সমস্ত প্রজেক্টের ৪০ শতাংশ এবং নির্মাণাধীন মসজিদের ৮০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। এই পর্যায়ে এসে আমার একার পক্ষে সব কাজ সম্পন্ন করতে কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আল্লাহর ঘর মসজিদ নির্মাণ করাসহ মানবকল্যাণের জন্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে ঐতিহাসিক ২০১ গম্বুজ জামে মসজিদ নির্মাণ কাজে শরিক হয়ে উক্ত প্রজেক্ট সম্পন্ন করতে সকলেই ইতিহাসের অংশ হবেন। মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে এ প্রকল্প শুরু করলেও এটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব মুসলিম বিশ্বের সব মানুষের। আমার পরিচিত কিছু ব্যবসায়ী বন্ধুর সহযোগিতায় এপর্যন্ত অনেকটুকু কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছি। তবে আমি হতাশ নই। কেননা মসজিদ আল্লাহর ঘর আল্লাহ তায়ালা নিজেই এর নির্মাণ কাজ শেষ করার তওফিক দিবেন।
মসজিদ উদ্বোধনের দিন মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সকলকে আমন্ত্রণ করা হবে। ইনশাল্লাহ মসজিদটি উদ্ধোধন করবেন সৌদি আরবের মক্কা শরীফের ইমাম।

Comments

comments


Top